সাংবাদিক আমিনুল হক ও কিছু কথা | Ekushey Bangla | একুশে বাংলা

সাংবাদিক আমিনুল হক ও কিছু কথা

সাংবাদিক আমিনুল হক ও কিছু কথা

সাংবাদিক সমিতির কুমিল্লা জেলা কমিটির সভাপতি এবং কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাপ্তাহিক মেগোতী পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক সাংবাদিক আমিনুল হক গত ৭ আগষ্ট এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে পরপারে চলে গেছেন। এটাই নিয়ম জন্মিলে মৃত্যুবরণ করতে হবে-এভাবে প্রত্যেকটি সৃষ্টি-ই নিঃশেষ হবে; প্রত্যেকটি জীভ মৃত্যুর দেশে প্রবেশ করবে। আজ আমি আগামী কাল আপনি-এভাবে চলছে ধরনী পৃষ্ঠে বিচরণকারী সৃষ্টি জীবের আগমন-প্রস্থানের খেলা। নতুন নতুন জীবের আবির্ভাব হচ্ছে আবার পুরাতন থেকে কিছু বিদায় নিয়ে যাচ্ছে। জন্ম-ই মৃত্যুর জন্য; সৃষ্টি-ই ধ্বংস প্রাপ্ত হওয়ার জন্য। যে চলে যাবে, যাবে-ই তো; তাকে তো আর ধরে রাখা যাবে না। কে কখন কাকে ধরে রাখতে পেরেছে। আবার কেউ চাইলেও চির অমরত্ব লাভ করতে পারে না। আকাশে উড়ে বেড়াও আর পানিতে ভেসে বেড়াও কিংবা ধরনীর পৃষ্ঠে বিচরণ করে বেড়াও- আর যাই কর; তোমাকে এবং আমাকে যেতেই হবে; আপন ঠিকানায়-যেখানে ছিলে তুমি। জন্ম-মৃত্যুর মাঝে সময় টুকু কত তা যদি একবার ভেবে দেখি তাহলে বুঝতে পারব-আসলে আমাদের হাতে সময় আছে কি-না। ইসলামের বিধান মতো কোন মুসলিম শিশু জন্মগ্রহন করার পর তার এক কানে আযান ও অন্য কানে ইকামত দেওয়া হয়—তারপর বাকি কি রইল? নামায-ই তো- যা ঐ শিশুটির প্রাণ ত্যাগের পর আদায় করা হয়। এত অল্প সময়ের স্থায়ীত্ব পেয়ে আমরা কতই না দাম্ভিকতা দেখাই। কতই না বাহাদুরী আর ক্ষমতার প্রভাব খাটাই; নিমেষেই ভুলে যাই নিজেদের জাত; ভুলে যাই সহকর্মীর কথা। ভুলে যাই তার কাছে থেকে প্রাপ্ত সুবিধাগুলোর কথা, ¯েœহ-মায়া-মমতা, ভালবাসার কথা। ক্ষ।িণকের স্বার্থ হাসিলের জন্য সহকর্মীদের কে ত্যাগ করতে দ্বিধাবোধ করি না। এই স্বার্থপরতা আর লোভ লালসার কারণে সংবাদ মাধ্যমগুলোতে এখন আর শিল্পগুণ নেই-শিল্পের কারিগররা ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে-চলে যাচ্ছে আমাদের ছেড়ে বহুদূরে। যেখান থেকে আর ফেরত আসা যায় না বা কেউ চাইলেও ফেরত আনতে পারে না। কুমিল্লার সংবাদ ও সাংবাদিক অঙ্গনের একজন শিল্পি ছিলেন সাংবাদিক আমিনুল হক। তার পত্রিকার মাধ্যমে অনেক সাংবাদিক তৈরী হয়েছেন। সেই আমিন ভাই তো চলে গেল কিন্ত সংবাদ মাধ্যম ও সাংবাদিক অঙ্গণ থেকে কি পেল? শেষ শ্রদ্ধাটুকুও পেল না। একজন সাংবাদিক হিসেবে প্রেস ক্লাবের অঙ্গণে সকল সাংবাদিকদের কাছ থেকে শেষ বেলায়-বিদায় বেলায় শ্রদ্ধা পাওয়া তার অধিকার ছিল কিন্ত সেই অধিকার থেকে তিনি বঞ্চিত হলেন। জেনে রাখ সাংবাদিক অঙ্গনের সকল সহকর্মীরা আজ সাংবাদিক আমিনুল হক শ্রদ্ধা থেকে বঞ্চিত হয়নি-হয়েছে পুরো সাংবাদিক সমাজ-কারণ আগামী দিনটা অপেক্ষা করছে তোমার জন্য-আমার জন্য।
প্রেস ক্লাবের প্রাঙ্গনে সাংবাদিকদের নিকট থেকে শেষ শ্রদ্ধাটুকু না পেলেও সাংবাদিক আমিনুল হক শত শত সাংবাদিকের হৃদয়ের শ্রদ্ধা ভালোবাসা ও দোয়া পেয়েছে ঠিক-ই এবং আগামী দিনেও পাবে। সাংবাদিক আমিনুল হক বেঁেচ থাকবেন তার কর্মের মাধ্যমে-তার হাতে গড়া সাংবাদিকদের হৃদয়ের গহীনে।
আমিন ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয় গাজী টিভির কুমিল্লা প্রতিনিধি মোঃ সেলিম মুন্সীর মাধ্যমে। তখন আমি দৈনিক রূপসী বাংলা পত্রিকায় কবিতা গল্প লিখি এবং মুন্সী আর্ট প্রেস থেকে মাসিক সাহিত্য কানন পত্রিকা প্রকাশ করি। পত্রিকা প্রকাশের কারণে প্রেসে আসা-যাওয়ার ফলে সেলিম মন্সীর সাথে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। সেই আলোকে সেলিম ভাই বুড়িচংয়ে বিভিন্ন সংবাদ দেওয়ার জন্য আমাকে বলেন। আমি আন্দনের সাথে বিভিন্ন সংবাদ প্রদান করি। কিন্ত সমস্যার সৃষ্টি হয়- প্রশাসনের সংবাদ সংগ্রহ করে। তাই সেলিম ভাইকে সমস্যার কথা বলতে-তিনি আমিন ভাইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। আমিন ভাই অত্যান্ত আন্তরিকতার সাথে সংবাদ লেখার বিভিন্ন কলা-কৌশল শিখিয়ে দেয় এবং বুড়িচং প্রতিনিধি হিসেবে কার্ড প্রদান করেন। তারপর থেকে মাঝে মধ্যে সাপ্তাহিক মেগোতীর অফিস মানিক মিয়া কউিনিটি সেন্টারের ২য় তলায় আসা-যাওয়া হতো। তিনি খুব ¯েœহ করতেন এবং সংবাদ সংগ্রহ ও লেখার বিষয়ে দিক নির্দেশনা দিতেন। কিভাবে একটি পরিপূর্ণ সংবাদ তৈরী করা যায়-সেই বিষয়ে আলোচনা করতেন। একজন দক্ষ সংবাদ কর্মী কিভাবে হওয়া যায় সেই বিষয়ে প্রায়ই আলোচনা করতে এবং মানুষের সাথে সু-সর্ম্পক গড়ে তোলার ব্যাপারে তাগিদ দিতেন। কারণ মানুষের সাথে সু-সর্ম্পক থাকলেই সংবাদ সংগ্রহ করতে সহজ হয়।
সাপ্তাহিক মেগোতীর অফিসে আসা-যাওয়ার ফলে ক্রমান্বয়ে পরিচয় হয় বার্তা সম্পাদক মোবারক হোসেন,খালেদ সাইফুল্লাহ, দেলোয়ার হোসেন আকাইদ, আবু মুসা, জাহিদ পাটোয়ারী, বৈশাখী টিভির আনোয়ার হোসেন এর সাথে। এরপর আমিন ভাইয়ের পরামর্শক্রমে সাংবাদিক সমিতির বুড়িচং উপজেলা শাখা গঠন করার জন্য দৈনিক আমাদের কুমিল্লার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও সাংবাদিক সমিতির কুমিল্লা জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শাহজাদা এমরান ভাইয়ের সাথে। যদিও বিভিন্ন কারণে সাংবাদিক সমিতির বুড়িচং উপজেলা শাখাটি গঠন করতে পারিনি।
কত কথা, কত স্মৃতি গেঁথে আছে হৃদয়ের পাতায়। আমিন ভাই নেই কিন্ত তার কথা গুলো যেন প্রতিধ্বনী হচ্ছে- সংবাদ
লেখার কলা-কৌশলগুলো এবং তার হাসিমাখা মুখখানি ভেসে উঠছে চোখের সামনে।
তিনি অসুস্থ হওয়ার প্রথম পর্যায় একদিন ফোন করে তার চৌকবাজার বাসায় নিয়ে ছিলেন। আমার মনে আছে সেই দিন দুপুরের পরে তার বাসায় গিয়েছিলাম। প্রথম আমার পরিবার ও কাজ-কর্মের খোঁজ খবর নিয়েছিলেন। তার পর নিজের অসুখের কথা বলেছিলেন। সেই দিন অনেক গল্প হয়েছিল দুই জনের মধ্যে আর সেই দিনের জানতে পারি তিনি আমাদের বুড়িচং উপজেলার ভারেল্লার বাসিন্দা এবং রণাঙ্গনের একজন মুক্তিযোদ্ধা। একে একে তিনি তার জীবনের ঘটে যাওয়া কত কথা বলে যাচ্ছিলেন। তার কর্মজীবনের কথা, রাজনৈতিক জীবনের কথা, সংসার জীবনের কথা, যুদ্ধকালীন সময়ের কথা-আরোও কত কথা। সেই দিন দোয়া নিয়ে চলে আসি। কর্মব্যস্থতার মাঝে আর যাওয়া হয়নি। কত স্বার্থপর হয়ে গেলাম-আর একটি বারের জন্যও খোঁজ খবর নেই নি। আসলে দৈনিক কর্মযষ্ণগুলো আমাদেরকে মেশিনে পরিণত করে ফেলেছে।
যার ফলশ্রুতিতে আমরা ছুটছি আপন গতিতে।
গত ৭ আগষ্ট সোমবার একটি জরুরী কাজে ইঞ্জিনিয়ার মোঃ ফরিদ ভাইয়ের সাথে ঢাকায় গমনের কথা ছিল। সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি গ্রহন করি-বিকাল বেলায় রওনা হব ঢাকার উদ্দেশ্যে। কিন্ত দুপুরে খালেদ সাইফুল্লাহর ফেইজবুক আইডিতে দেখতে পেলাম আমিন ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদ। সেটি নিশ্চিত করার জন্য আমিন ভাইয়ের ভাতিজা সাংবাদিক দেলোয়ার হোসেন আকাইদকে ফোন করে নিশ্চিত হলাম যে-তিনি পরপারে চলে গেছেন। আসরের সময় চকবাজারের প্রথম জানাযার নামায, মাগরিবের পর ইবনে তাইমিয়া স্কুল এন্ড কলেজ মাঠে দ্বিতীয় জানাযা, এশার নামায পরে শংরাইশ মসজিদের তৃতীয় জানাযার নামায অনুষ্ঠিত হবে এবং দ্বিতীয় জানাযার নামায শেষে কুমিল্লা প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গনে সাংবাদিকদের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য লাশ আনা হবে। কিন্ত পরবর্তীতে কোন অদৃশ্য কারণে প্রেস ক্লাবের সামনে আমিন ভাইয়ের লাশ আনা হয়নি। যা কিছু আচঁ করতে পেরেছি-দৈনিক আমাদের কুমিল্লার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক শাহজাদা এমরান ভাইয়ের প্রবন্ধের মাধ্যমে।
গত ১১ আগষ্ট সাংবাদিক দেলোয়ার হোসাইন আকাইদের একটি মেসেজ পাই। যা সাংবাদিক সমিতির কুমিল্লা শাখার সাধারণ সম্পাদক শাহজাদা এমরান ভাইয়ের পক্ষ থেকে দাওয়াত করা হয়েছিল। গত ১২ আগষ্ট সাংবাদিক আমিনুল হকের স্মরনে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। উক্ত দোয়া ও মিলাদ মাহফিলে যোগদান করার একান্ত ইচ্ছা থাকলেও প্রবল বর্ষনের কারণে সেই দোয়া অনুষ্ঠানে যোগদান করতে পারি নি। প্রকৃত পক্ষে এটাই সত্য যে মানুষ চাইলে সবকিছু করতে পারে না। বিধি যা চান তাই হয়। এই সত্যটিকে আমরা মানতে চাই না। আমিন ভাই চলে গেছে রেখে গেছে আমাদের মতো অনেক কর্মী; যাদের অন্তরে তিনি থাকবেন চিরকাল। আল্লাহ রাব্বুল আল-আমিন যেন, আমিন ভাইকে জান্নাত বাসী করেন। শেষ কথা- হারিয়ে গেছে সোনার মানুষ
খোঁজ তারে কোন বনে
খোঁজলে কি পাওয়া যায়
তারে হৃদয়ের গহীনে।।

ফেসবুক মতামত

WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com