লাল-সবুজ আর স্বাগতমে এক টুকরো বাংলাদেশ | Ekushey Bangla | একুশে বাংলা

লাল-সবুজ আর স্বাগতমে এক টুকরো বাংলাদেশ

লাল-সবুজ আর স্বাগতমে এক টুকরো বাংলাদেশ

আমি নিউইয়র্ক থেকে সবে তখন কানাডার সবচেয়ে ছোট প্রদেশ প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ডে (পিইআই) এসেছি। সনটা ২০০৮ নিশ্চিত, তবে সময়টা এদিক–ওদিক হতে পারে—অক্টোবর বা নভেম্বর। কুইন শারলট ইন্টারমিডিয়েট স্কুলের অফিস ঘর। মেয়ের কী এক প্রয়োজনে যাওয়া। ঢোকার সময় খেয়াল করিনি কিন্তু বেরিয়ে আসার সময় চোখ চলে গেল অফিস ঘরের উল্টোদিকে সাদা বিশাল বোর্ডটাতে। বিভিন্ন ভাষার অক্ষরে লেখা কিছু কথা। কাছে গিয়ে ভালো করে দেখি আমি। সবই অচেনা আর তখনই চোখ আটকে গেল হিন্দিতে লেখা স্বাগতমে। আরে বাহ্‌ এটা তো বিভিন্ন ভাষার সম্ভাষণ! কিন্তু বাংলা কোথায়? আমি আবার ঢুকি অফিস ঘরে।

ওয়েলকাম বোর্ডের সামনে মাউরিন ডাফিমাফ করবেন এই বোর্ড কীসের?
তিনি সেক্রেটারি। একটু গম্ভীর গোছের। চশমার ওপরে চোখ তুলে আমার দৃষ্টি অনুসরণ করলেন।
ওয়েলকাম বোর্ড। তাঁর খুব সংক্ষিপ্ত উত্তর।
রাইয়ান ও লাল–সবুজের বাংলাদেশআমি আবার ঘাঁটাই, ইয়ে আমার ভাষা বাংলা। উনি ভ্রু তোলেন, আমি তাড়াতাড়ি কথা শেষ করি, ওটি নেই ওখানে। এবার তার মুখ নরম হয়।
এই বোর্ডটা কেবল ইএএল স্টুডেন্টদের মূল ভাষা ও তারাই করেছে। আমি নিজের মগজের ভেতর জোর ঘুটা দিই। নাহ্, ইএএল বস্তুটি কীসের অ্যাক্রোনিম কিছুতেই বুঝে উঠতে পারি না। ধন্যবাদ দিয়ে হাসি হাসি মুখ করে বেরিয়ে আসি। মেয়ে বাড়ি ফিরতেই ওকে চেপে ধরি।
ইএএল কি?
মেয়ে থতমত খায়, ইংলিশ অ্যাজ অ্যান অ্যাডিশন্যাল ল্যাঙ্গুয়েজ। কেন?
আমি ঘটনা বলি। আমার মেয়ে এই বোর্ডের খবরই জানে না।
এক্কেবারে ঢোকার মুখে দেখিসনি?
ওরা পেছনের দরজা দিয়ে ঢোকে তবে বেরোয় সামনের গেটে। বাড়ি ফেরার তাড়া, দেখার ফুরসত কই?
আমি রেগে যাই। বলি তুই ইএএলের টিচারকে গিয়ে বলবি আমাদের ভাষা ঢোকাতে।
আমার মেয়ে হাসে।
এটা ইএএল স্টুডেন্টদের জন্য। কখনো যদি বাংলাদেশের কোনো শিক্ষার্থী আসে এবং ইংরেজি শেখার প্রয়োজনে ইএএল ক্লাসে যুক্ত হয় তখনই বাংলা ভাষা নিজ গরিমায় বোর্ডে উঠবে এবং স্বাগতম বলবে।
আমি মনে মনে ভাবি এটা আবার কেমনতরো হিসাব? স্বাগতম বলতে হলে ইংরেজি শেখার ক্লাসে ঢুকতে হবে? আমার মেয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে চলে যায়।
মেয়ের জুনিয়র-হাই শেষ হয়। ওর সেই তিন বছরের শিক্ষাবছরে ইংরেজি জানা অথবা না-জানা কোনো বাঙালি ছাত্রছাত্রীই কুইন শারলটের চৌহদ্দিতে পা মাড়ায়নি।
পাঁচ বছর পরে আবার সেই কুইন শারলট। এবার আমার ছেলের পালা। তত দিনে শারলটটাউনে আমার পরিচিতির গণ্ডি বেড়েছে। স্কুলগুলোতে বিভিন্ন ভলান্টিয়ারিং বোর্ডে মাঝে মাঝে ফুরসত পেলে কাজ করি আমি। সেই হিসেবে কুইন শারলটেও যাওয়া আসা বাড়ে। আশ্চর্য হয়ে দেখি এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও ওয়েলকাম বোর্ডে বাংলা ভাষা নেই এখনো! তার মানে কুইন শারলটের ইএএল কার্যক্রম বাঙালি ছাত্রছাত্রীবিহীনই থেকে গেছে। আমার ছেলে ক্লাস নাইনে উঠে যায়। এটাই ওর জুনিয়র হাই–এর শেষ বছর তারপরেই হাইস্কুল। ফেব্রুয়ারির শুরুতে কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ মনে হয় আহা যদি ভাষার মাসে ওয়েলকাম বোর্ডটাতে বাংলা দেখতে পেতাম! সঙ্গে সঙ্গে প্রিন্সিপালকে অনুযোগ করে ইমেইল করি—মেয়ে তো বেরিয়ে গেছে, ছেলেও বেরিয়ে যাচ্ছে, তাও ওয়েলকাম বোর্ডে বাংলায় সম্ভাষণ দেখার সৌভাগ্য হলো না! অন্য সব ভাষার সঙ্গে এই ভাষায় সম্ভাষণ তোমার স্কুলে সৌহার্দ্য তো বাড়াতই বাচ্চারাও তাদের কৃষ্টিকে শ্রদ্ধা করতে শিখত এবং নিজের উৎস নিয়ে গর্বিত হতো। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এই মাসে, সৌম্যদীপের মাতৃভাষা এইসময় যদি ওয়েলকাম বোর্ডে অন্য ভাষার পাশে স্থান পেত তবে দারুণ হতো।
মেইল পাঠানোর মিনিট দশেকের মধ্যেই প্রিন্সিপাল মি. গ্রিমারের উত্তর—ধন্যবাদ রঞ্জনা স্কুল বর্তমানে ২৫টা দেশের প্রতিনিধিত্ব করছে এবং বাংলাদেশ তার মধ্যে একটি। তোমার চিঠির সুর আমাদের ইচ্ছের সঙ্গে মিলে গেছে। আমরা আমাদের স্কুলের প্রতিনিধিত্বকারী সব দেশের ভাষাকে এই বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করার কর্মসূচি হাতে নিয়েছি, সোম্যদীপকে এই আয়োজনে শরিক হতে আমন্ত্রণ জানাই।
মনে মনে বলি, হুম, এত দিন লাগল বুঝতে!
মার্চে স্কুল বছরের শেষ পেরেন্ট-টিচার মিটিং। স্কুল জিমের চৌকাঠ পেরোতেই প্রিন্সিপাল গ্রিমার গালভর্তি হাসি নিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন এবং পরিচয় করিয়ে দিলেন ইএএল প্রশিক্ষকের সঙ্গে। প্রিন্সিপাল তাকে জানালেন, রঞ্জনা অনেক দিন ধরে ওয়েলকাম বোর্ডে বাংলা ঢোকানোর কথা বলছিল।
প্রশিক্ষক ভদ্রমহিলা অনুরোধ করলেন বাংলায় স্বাগতম লিখে তাঁকে যেন পাঠিয়ে দিই আমার ছেলের মাধ্যমে। আমি এ কান-ওকান জুড়ে হাসি। মে মাসের শেষে আমার ছেলে খবর দেয় ওয়েলকাম বোর্ডে সব ভাষায় সম্ভাষণ লেখা শেষ না হলেও বাংলায় স্বাগতম লেখা হয়ে গেছে। কী যে খুশি লাগে আমার। শেষ পর্যন্ত হলো তবে! তর সয় না আমার। প্রিন্সিপাল গ্রিমারকে আবার মেইল, ছবি তুলতে চাই। কিন্তু তিনি স্কুল ছেড়ে যাচ্ছেন। নতুন চাকরি। এবার ইস্টার্ন স্কুল বোর্ডের হর্তাকর্তা। তবে যাওয়ার আগে ভাইস-প্রিন্সিপাল ডাফি, যিনি এই প্রজেক্টে সরাসরি যুক্ত তাঁকে আমাকে সব রকম সহযোগিতা করার অনুরোধ জানিয়ে যান।
মাউরিন ডাফি, ভাইস প্রিন্সিপাল; সুন্দরী, চটপটে ও হাসিখুশি। কুইন শারলটের এই ওয়েলকাম বোর্ডের ইতিহাস জানান ঝটপট। এই বোর্ডের শুরুটা প্রায় নয় বছর আগে। ওই সময় প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ডে চীন দেশীয় অভিবাসীদের ভিড়। ইএএল প্রোগ্রামে মূলত এরাই শিক্ষার্থী। এই শিক্ষার্থীদের মূলস্রোতে অনায়াসে কীভাবে জুড়ে দেওয়া যায় তার ভাবনা থেকেই ওয়েলকাম বোর্ড প্রাণ পায়। আর এই ধারণার মূল রূপকার ছিলেন শিল্পকলার শিক্ষক মিসেস প্যাকার্ড। স্কুলের প্রধান ফটকে দিনের শুরুতে সদ্য দেশ ছেড়ে আসা এই সব কিশোর কিশোরীদের নিজেদের মাতৃভাষায় লেখা সম্ভাষণের অক্ষরগুলো তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে এবং কুইন শারলট ইন্টারমিডিয়েট স্কুল পরিবারে দ্রুত যুক্ত হতে সাহায্য করবে। কী দারুণ ভাবনা! ছবি তোলার জন্য প্যাকার্ডকে পাওয়া গেল না। তিনি অবসরে গেছেন সম্প্রতি। মাউরিনকে বলি, বোর্ডের পাশে দাঁড়িয়ে পোজ দাও; ওয়েলকাম বোর্ড নিয়ে আমার দেশের পত্রিকায় লিখব। হাসিখুশি মাউরিন সকালবেলা তাঁর দাপ্তরিক কাজ বাদ দিয়ে হাসিমুখে দাঁড়ায় বোর্ডের পাশে। চোখ টিপে বলেন, আমি তবে স্টার হয়ে গেলাম! আমি মনে মনে বলি, ইতিহাস হয়ে গেলে।
ইএএল প্রশিক্ষকের কাছে সেই পেরেন্ট-টিচার ইন্টারভিউয়ের দিনই জেনেছিলাম শহরের ওয়েস্ট রয়্যালটি এলিমেন্টরি স্কুলের হলওয়ে জুড়েও বিভিন্ন দেশের জাতীয় পতাকার সন্নিবেশ করার পরিকল্পনা আছে স্কুল কর্তৃপক্ষের; বাংলাদেশের পতাকাও থাকছে সেখানে। বাঙালি কমিউনিটির বেশ কজন বাচ্চা পড়ে ওই স্কুলে। আমাদের রাইয়ানও পড়ে। রাইয়ানের মা রিজওয়ানার সঙ্গে কথা হয়। ও জানায় ওদের কাছে বাংলাদেশের তথ্য চেয়ে পাঠিয়েছিলেন প্রিন্সিপাল। হলওয়েতে লাল সবুজ পতাকা দুলছে এখন। রাইয়ানই মাকে হাত ধরে টেনে দেখিয়েছে এই অবাক ঘটনা, বাংলাদেশ পতাকা হয়ে দুলছে অলিন্দে।
রাইয়ান মাত্র দুই বছর বয়েসে এসেছিল কানাডায়। আধো আধো বোলে দিনাজপুরের টানে বাংলা বলত। এই এইটুকুন রাইয়ান অন্য দেশের পতাকার ভিড় থেকে ঠিক জন্মভূমির লালসবুজ চিনে নিয়েছে! মন ভরে যায় আমার। ঠিক করি যাব রাইয়ানের স্কুলে। দেখব কেমন সাজল বাংলাদেশ। রিজওয়ানা আগেই অনুমতি নিয়ে রেখেছিল অফিসে। রাইয়ানকে ক্লাস থেকে ডেকে এনে লাল পাঞ্জাবি পরিয়ে দেয় ওর মা।
হলওয়েতে মাথার ওপর পতাকা, কায়দা করে ছোট রাইয়ানকে পতাকার সঙ্গে ফোকাসে এনে ছবি তুলতে বেশ বেগ পেতে হয়। ফেরার সময় আরেকবার দেখি পতাকাটা। কত দেশের পতাকা দুলছে পাশাপাশি। প্রত্যেকে স্বতন্ত্র অথচ কী সুন্দর সাম্য এই হরেক রঙের কোলাজে! এভাবে যদি সারা পৃথিবীর মানুষ জুড়ে যেত সাদা-কাল, জাত-পাত, ধর্মের বিভেদ ভুলে তবে পৃথিবী কী সুন্দর আর মায়াময়ই না হতো!
রাইয়ান আর সৌম্যদীপ কিংবা ওদের বিভিন্ন ভাষাভাষী বা বর্ণের বন্ধুদের জন্য স্বপ্নের সেই পৃথিবীর আকাশ জুড়ে ঘনঘটা আজ, তাও আশা ছাড়ি না—একদিন সব পাল্টাবেই।

ফেসবুক মতামত

WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com