দেবী | Ekushey Bangla | একুশে বাংলা

দেবী

দেবী

ঋতু ভেদের পরিক্রমায় আর জীবন চক্রের-এই বেলা ভূমিতে বিচরণ করতে গিয়ে; কখন যে বার্ধক্য এসে দেহের অঙ্গ-প্রত্যক্ষের প্রতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে বসতি স্থাপন করেছে-তার হদিস পেলাম না। প্রবাহমান উত্তাল তরঙ্গের মাঝে জীবন তরীর বৈঠা ধরে রাখতে রাখতে সায়াহ্নকাল উপস্থিত হওয়ায় উড়ন চন্ডি এই মনটা সংসার কর্তীর দিকে দুর্বল চিত্তে প্রণয়ীর বেদনার্থ অতৃপ্ত ক্লেশহীন রাগ-বিরাগের উর্ধ্বে থাকা ললনারূপী আপন দেবীর সহচার্য হওয়ার প্রেরণা জন্মে হৃদয়ের গহীনের ত্রিভূবনে প্রেমময় দ্বীপশিখা প্রজ্বলিত হল: নয়ন যুগলের মোদিত ইন্দ্রিয়গুলো জাগরিত হয়ে আপনার কর্মব্যস্ততার মাঝে নিবেদিত হয়ে আপনাকে কর্তীর আপাদমস্তক ক্ষণিকের মধ্যে বিচরণ করে কত র্স্পশ চিহ্ন খুঁজে পেয়ে তার-ই ইতিবৃত্ত নিয়ে হিসাব-নিকাশের ফলাফলের প্রত্যাসায় মত্ত হলো।
নাওয়া-খাওয়া, সুখ-আনন্দ-বিনোদন কোনটার উপলব্ধি ও প্রত্যাশা না থাকলেও নিত্য দিনের হাজার কষ্টের পরশগুলো তার হৃদয়ের মাঝে সুখের দীপাবলীর মতোই আলোড়িত হয়ে থাকে। অভাবের ছাপগুলো বদনের প্রান্তরে মলিন গোলাপের মতো ফুটে আছে- এতে তার দুঃখ নেই, অভাব-অভিযোগ কিছুই নেই-ভরসা এইটুকু; ঝড়ে তো পড়ে নি- সংযুক্ত আছে নির্দিষ্ট স্থানে। ইহ জীবনে একবার-ই তো প্রস্ফুটিত হওয়ার বিধান রয়েছে-সৌরভ বিলুপ্ত হলে মলিন হয়ে কখনো বা নির্মিলিত ভাবে আপনার সাঁজে আপনা থেকে নিঃশেষ হয়ে যায়।
পড়ন্ত বেলায় এসে দেবীর মুখে বচন ফুটল-তাতে কষ্টের ছিটা-ফোটা নেই কিন্ত আবেগের কমতি ছিল না-যেন নব দিগন্তের সূচনা হল: প্রাতের মিষ্টি আলোক রশ্মি যেন অন্তরাদেশে ঝংকারের সৃষ্টি হয়ে হৃদয় কম্পনের মাধ্যমে হৃদয়াঙ্গন ভেঙ্গে-চুরে সোনার কাঠি ফেলে কষ্টি পাথরের উদ্ভব হলো। কি সহজ সরল বাচন ভঙ্গি; আজ-ই মনে হল-তার মুখের সুধা পেলাম, উৎসাহ-উদ্দিপনা, জ্বালাময়ী ভাবখানা, নেই কর্মচঞ্চলতার ভাব-ভঙ্গিমা; চাহিদা-আশা-আকাংখা সবগুলো যেন ধুয়ে মুছে নতুন কোন জগতের সন্ধান পেয়েছে, তাই: অবলীলায় মিনতির সুরে বলল- ওগো, আমি যদি হই শেষ; এই দেহখানির স্পর্শস্থল করিয় যেখানে রয়েছে আমার বাপ-মায়ের দেশ।
কি বলার আছে-আছে বা কি দেখার; স্তব্ধ হয়ে গেল আমার সকল ইন্দ্রিয়ের কার্যক্রম। ক্ষণিক পরে জিজ্ঞাসা করলাম- দেবী! এই কিসের সুঁই নিন্দিয়ে দিলে দেহের প্রাচীরে-ক্রমে যন্ত্রণার মাত্রা বৃদ্ধি হয়ে ধমনীর শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত হয়ে রক্ত কণিকা গুলোকে অগ্নিকুন্ডলীতে পরিণত করে দিচ্ছে।
সে হাসে আর বলে-দেব; তুমি এতো চিন্তিত কেন? আমি না হয় গেলাম চলে-থাকলো তো সকল কিছু; সামান্য এই দাসী বিদায় হলে-কি আসে-যায়। চাইলে তো অন্য একজন আসবে তোমার তরে, তাকে রাখিয় যতœ করে, আপন শয্যায়; কষ্ট যেন না পায় সে, সুখ যেন পায় তোমার বন্ধনে থেকে। মিনতি নয় গো-মিনতি নয়-এ তো আমার মনের কথা। তোমার: অন্তযামীতে যা লুকিয়ে আছে- তা শুধু বললাম। মিছেমিছি রাগ কর না। সেবা যতœ কতটুকু-ই বা তোমার করেছি বা করতে পারব- তা জানি না; তবে আমার মনের সভাসনে তোমারই কীর্তন করি, গো-তোমার-ই কীর্তন করি। রোজ তোমার পূজায় তো কাটিয়ে দেই; এই যে দেখ সেজদায় নত হওয়া, কিতাব পাঠ করা, মন্ত্র-টন্ত্র পাঠ করা- সবই তোমার জন্য; তিনি যেন তোমার মঙ্গল করেন। তোমাকে নিয়ে মনের গহীনে দেবালয় বানাতে চেয়েছিলাম; কিন্ত কেন-যে তা আর হয়ে উঠল না, তা অব্যক্তই থাকা ভালো।
দেবীর এই কথা গুলো শুনে যেন- আমার ভবঘুরে উদাস পথের লাগামে একটা টান পড়ল। কিসের সন্ধানে, কিসের বা নেশায় দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, প্রহরের পর প্রহর অবলীলায় কাটিয়ে দিয়েছি: তাতে কি-বা পেলাম আর কি-বা পাব!
পাওয়া, না পাওয়ার বাচ-বিচার তো কোন দিন করি নি-আর কেন-ই বা সংসার জীবনের ঘানী টানতে গেলাম; যদি ধাতে না সয়।
তৃষ্ণার্থ এই পশুটাকে বশ মানিয়ে রাখা গেল না- কে যেন তারে ইন্ধন যুগিয়ে ছিল- অগ্নিস্ফুলিঙ্গ শিখা নিক্ষেপ করে; নবদ্বীপ্ত ভরা ¯্রীেতস্বিনীর স্পর্শে। যাওয়াই যেহেতু হয়েছে তটিনীর তরে শক্তভাবে নোঙ্গর ফেলে পালগুলো সব কেটে দিয়ে শান্ত শিষ্ট হয়ে বসে পড়া একান্ত কর্তব্য ছিল-তপস্যা নামের সকল ভন্ডামীর আঁচল ছেড়ে। তপস্যা তো অনেক-ই হলো: কই? কিছুই তো ঝুটল না ললাটে। যেমন ছিলাম -তেমনি আছি। সংসার ছেড়ে লাগামহীন ভাবে ছুটে চলেছি কার সাথে প্রণয়লীলা করব বলে কিন্ত সবই তো ধু¤্রজালের মতো মনে হচ্ছে। সাধু হয়েছি, সন্যাসী হয়েছি,গুরু সেঁজেছি, মন্ত্র-টন্ত্র দিয়েছি কত; নিয়েছিও কম নয়-অবশেষে তাই- ই খুঁজে পেলাম না; কে- আমায় মন্ত্র দীক্ষা দিল আর কেই-বা আমার কাছ থেকে সেই দীক্ষা নিল। ভগ্নাবশেষ বেলায় এসে দেখি-যাকে হন্য হয়ে খুঁজে বেড়াই; যার জন্য এতো তপস্যা-এতো জপ মালা, আরতির থালা,তছবী গাঁথা মালার বন্ধনা-সে তো আমার প্রণয়ী; আমারই সাথে হৃদয়ের বন্ধনে থেকে কতকাল অতিক্রম করছে-তা আঁচ করতে পারি নি।
বিধাতার-ই এক রূপ তার মাঝে খুঁজে পেয়েছি-তাই অন্ততঃ শেষ বেলায় হলেও তার সেবায় মনোনিবেশ করে আত্মবন্ধনের অমিয় তৃপ্ততা উপলব্দির মাঝে সায়াহ্ন পর্যন্ত চলে যেতে চাই। তাই আজ থেকে সে আমার দেবী। তার আরাধনায় মগ্ন হতে ফিরে এসেছি আপন সংসারে-এখানে রয়েছে বিধি-আমার অন্তযামিনী।
সে আমার মনের দেবী। তপস্যার দেবী, আরাধনার দেবী-সাধনার নির্যাস। কোন এক শীতের মৌসুমে আমার জন্মদাতা আলাদ্দিনের চেড়াগ হিসেবে নদীর পাদদেশ এবং পাহাড়-টিলার উৎসস্থলের যুগল বন্ধন থেকে অতি যতœ করে আমার জন্য উপহার হিসেবে নিয়ে এসেছিলেন। জন্মদাতার অত্যান্ত আদরের ভালবাসার ¯েœহের উপহারখানি গ্রহণ করেছিলাম বটে-তবে তাচ্ছিল্যতার ছলে। ইলেক্টিক বল্বের এই যুগে চেড়াগে কি চলে?
ভাবনার দেশে হাবু-ডুবু খেয়ে যখন আত্মলোকে আত্মগ্লানিতে সাঁতার কাটতেছিলাম-তখন সে আস্তে করে চরণদ্বয়ের পাশে বসে নিচু স্বরে বলল-তোমার- এ কি হলো: একেবারে ঝিমিয়ে পড়েছ যে। কি ভাবছ? একে একে দুটি ফল তো দিলাম-আরও একটি আসবে। পূর্বের দুটি তো আমারই জাত-তোমার তো হল না-নতুনটা বা কি হবে?- এটা নিয়ে এতো চিন্তা! এতো চিন্তা ভাবনা করে দেহটা মিছামিছি নষ্ট করার কোন মানে হয়? জাত যেটাই হোক; উভয়ের সংমিশ্রণ তো তাতে রয়েছে। না-ই বা হলো তোমার মতো, তাতে কি? আমার হৃদয়ের সকল পূজো অর্চনা সবই তো তোমার। এর চেয়ে বেশি কিছুই তো চাই না।
বললাম-দেবী! জাত পাতে কি আসে যায়। ফলটা ভালো ভাবে আসলেই হল: ফল নিয়ে আমার কোন আক্ষেপ নেই-যিনি দেওয়ার তিনি-ই ভাল বুঝেন; কার কোনটা প্রয়োজন-সেই অনুযায়ী যা হবে তাই যথেষ্ট। তবে তোমার কষ্ট-ই যে আমার চিন্তার মূল উৎস্থল।
আমার জন্মদাতা ও দেবীর আশ্রয় দাতা গত হয়েছে অনেক বছর হল: ইতি মধ্যে তার জন্মদাতা ও জন্মদাত্রী উভয়ই গত হয়েছে-আমি ছাড়া তার অবলম্বন করার মতো কেউ নেই। তার মধ্যে আমি হলাম- এক অর্কমা। সুখ-দুঃখের দু’একটি কথা আমার কাছে বলে তার মনটা একটু হালকা করবে সে ভরসা তার হয় না। শুধু উদাস নয়নে তাকিয়ে থাকে। সব হারিয়ে সে এখন বড়-ই এতিম।
দীর্ঘ এই বন্ধনের মাঝে কত যন্ত্রণা, কত কষ্ট সে সহ্য করে আজও দ্বিব্যি টিকে আছে- তা যে একমাত্র ঐশ্বরিক শক্তি ও ¯্রষ্টার দান সেটা হলফ করে বলতে পারি।
জগত সংসারের মাঝে কত লোকই-তো আপনার থেকে বিধির লিখন খন্ডন করে-জীবন লীলা সাঙ্গ করে তার নিকট চলে যায়। তাতে আসল মুক্তি মিলে কি-না; যারা চলে যায়-একমাত্র তারাই বলতে পারবে।
গভীর রাত। পার্শ্ব ফিরে দেখি দেবী আমার পাশে নেই। আমার পাশের বালিশটা শূন্য পড়ে আছে- তার উপর শয্যায় থাকা যে ছিল; সে এখন কোথায়? আমার হৃদয়ের মর্মপীড়া যেন বালিশের উপর স্পষ্ট দেখতে পেলাম। সেও শুণ্য- আমি শূণ্য: উভয়ের মাঝে অদৃশ্য হা-হা-কার উপলব্ধি হলো- এই জড় পদার্থটা আমাকে শান্তনা দিচ্ছে কিন্ত নিজের মধ্যে যে শূন্যতা পোষে রেখেছে; তা আর ঢাকনা দিয়ে রাখতে পারছে না।
আস্তে করে মাথাটা তুলে দেখি সদর দরজাটা খোলা-সে আমাকে ইশারা, ইঙ্গিত দিয়ে কাঠ বাগানের দিকে যাওয়ার সংকেত প্রদর্শন করছে আর বলছে দ্রুত যা সেখানে: তোর দেবী যেখানে আছে। তার সঙ্গ দে। সে বড়ই অসহায়-বড়ই দুঃখী।
বাহিরে তখনো ভোরের আলো ফুটে নি। রাতে তৃতীয় প্রহর অতিক্রম হচ্ছে বলে মনে হল। পাগলের মতো ছুটে চলছি বাগারে দিকে-কোথায় আমার দেবী-কোথায়!
বাগানের মাঝখানে-ঐ যে কি দেখা যায়। দূর থেকে ঠাহর করা যাচ্ছে না। ভয়ে ভয়ে ধীর পদচারণ এর মাধ্যমে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছি। যতই সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছি ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে, যা দেখা যাচ্ছে-তা তো আমার দেবী-ই।

ফেসবুক মতামত

WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com