তাকওয়া অর্জনে মাহে রমজানের ভূমিকা

তাকওয়া অর্জনে মাহে রমজানের ভূমিকা
মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর মহা নিয়ামত রহমত,বরকত,মাগফিরাত ও জাহান্নামের শাস্তি থেকে  মুক্তির মাস রমজানুল মোবারক তাঁর বান্দাদের জন্য অর্থাৎ আমাদের জন্য দান করেছেন। তাই সকল মুমিন- মুসলমানদের উচিত এ মাসের প্রতিটি মুহূর্তকে গুরুত্ব দিয়ে কাজে লাগানো। সিয়াম- সাধনার মূল লক্ষ্যই তাকওয়া অর্জন। এরশাদ হচ্ছে, ” হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, আশা করা যায়( এতে) তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারবে”( সূরা- আল বাক্বারাঃ১৮৩)। উক্ত আয়াতে আমরা আল্লাহ তায়ালার ৩ টি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা পাই।  (১) মাহে রমজানের সিয়াম- সাধনা সকল মুসলমানের উপর আবশ্যক তথা ফরজ এবাদত।(২) এ রোজার বিধান শুধু আমাদের উপর ফরজ করা হয়নি ; বরং পূর্বের বহু জাতি- গোষ্ঠীর উপরও ফরজ  ছিল।(৩) সিয়াম- সাধনার মূল লক্ষ্যই হল  তাকওয়ার গুণাবলী অর্জন করা। ইসলামে রাজা- প্রজা,ধনী- গরীব, সাদা- কালো,ভাষা,জাতি,গোত্র ও বংশের মাঝে কোন ভেদাভেদ নেই; বরং সকল মুসলমানের মাঝে সাম্যতা আনায়ন করে অর্থাৎ ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করে। তাকওয়া মানুষকে সম্মানিত করে, মর্যাদার আসনে সমাসীন করে।  এরশাদ হচ্ছে, ” তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তি অধিক মর্যাদা সম্পন্ন,  যে বেশি তাকওয়াবান”( সূরা আল- হুজুরাতঃ১৩)।
তাকওয়ার আভিধানিক অর্থঃ তাকওয়া, আল্লাহর ভয় , পরহেজগারি, সংযম, সাবধানতা অবলম্বন,  ধার্মিকতা ইত্যাদি। পরিভাষায় ঃঃ ইসলামের আদিষ্ট বিষয়গুলোর পালন, নিষিদ্ধ বিষয়গুলোর বর্জন ও আল্লাহ তায়ালার নিকট জবাবদিহিতার অনুভূতিই তাকওয়া।  আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনের ঘোষণা করেন, ” তোমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা কিছু নিয়ে এসেছেন, সেগুলো আঁকড়ে ধরো আর তিনি যেসব বিষয়ে নিষেধ করেছেন, সেগুলো থেকে বিরত থাক “( সূরা আল হাশর-৭)।
  মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে হালাল- হারাম, ন্যায়- অন্যায়,  সত্য- মিথ্যা, উচিত- অনুচিত ইত্যাদি বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ থাকার মাঝেই তাকওয়ার গুনাবলি নিহিত ।  কোরআনে পাকে একাধিক স্থানে আল্লাহ তায়ালা এবিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে বলেন, ” হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আমাকে ( আল্লাহ) কে ভয় কর, ঠিক যতটুকু তাঁকে ভয় করা উচিত আর তোমরা পরিপূর্ণ মুসলমান না হয়ে মৃত্যু বরণ কর না “( সূরা আল – ইমরানঃ১০২)।  অন্যত্র বলা হচ্ছে, ” হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় কর ( তাকওয়ার গুনাবলি অর্জন করতে পার) তাহলে তিনি তোমাদের জন্য ( অন্যদের  থেকে)  পার্থক্যকারী কিছু স্বতন্ত্র মর্যাদা দান করবেন, তোমাদের পাপ মোচন করবেন এবং কৃত অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন “( সূরা আল- আনফাল ঃঃ ২৯)। ” যেসব জনপদবাসী ( যদি) বিশ্বাস স্থাপন ও তাকওয়ার গুনাবলি অর্জন  করতো,  তাহলে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের বরকতের সব দুয়ার আমি তাদের জন্য খুলে দিতাম”( সূরা আল- আরাফঃ৯৬)। আরো ইরশাদ হচ্ছে, ” ( হে বিশ্বাসীরা)  তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আশা করা যায় যে তোমরা সফলতা লাভ করবে ” ( সূরা আল- বাক্বারাঃ১৮৯) ।
এতে বুঝা যায় যে, রহমত, বরকত, মাগফিরাত, সফলতা ও মহান আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্ট লাভ করতে হলে  আমাদেরকে অবশ্যই তাকওয়ার সকল গুনাবলি অর্জন করতে হবে।
মাহে রমজান হচ্ছে সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস, স্বীয় অপরাধ ক্ষমা করিয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করার সর্বোৎকৃষ্ট সময়। রোজার প্রতিটি রীতি- নীতি এবং কার্যকলাপে তাকওয়ার শিক্ষা নিহিত। ক্ষুধা- তৃষ্ণার তীব্র চাহিদা থাকা সত্বেও একজন রোজাদার সারাদিন খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ করে না ; কারণ সে আল্লাহকে ভয় করে। আর একটি বিষয়, রোজাদার হৃদয়জুড়ে এ বিশ্বাস, কেউ দেখুক আর না- ই দেখুক, মহান আল্লাহ তায়ালা তাকে দেখছেন যিনি সকল কিছুর নিয়ন্ত্রক ও পর্যবেক্ষক সুতরাং পানাহার করা যাবে না, রোজার সাথে সাংঘর্ষিক কোন কাজ করা যাবে না, তাঁর কোন আদেশ- নিষেধ অমান্য করা যাবে না। এ প্রসঙ্গে হযরত আবু হুরায়রা  (রাঃ)  হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ” যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখলো কিন্তু অশ্লীল কথা ও কাজ পরিহার করতে পারলো না – তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই “( বুখারী শরীফ)। আল্লাহ তায়ালার আদেশ- নিষেধ মেনে চলার অনুভূতিই তাকওয়া, যা অর্জনের এক সর্বোৎকৃষ্ট সময় মাহে রমজান। মাসব্যাপী  প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত তাকওয়ার গুণে যদি কোন ব্যক্তি রোজার পরেও বজায় রাখে, তাহলে তার পক্ষে মিথ্যা বলা, অন্যের হক নষ্ট করা,  ঘুষ ও সুদ খাওয়া, আমানতের খেয়ানত করা, প্রতারণা করা, খাদ্যে ভেজাল দেয়া, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অযৌক্তিকভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করে জনসাধারণের ভোগান্তি বাড়ানো, চুরি- ডাকাতি, ছিনতাই, ইভটিজিং,  ধর্ষণসহ সকল অন্যায় কাজ করা এবং দুর্নীতিপরায়ণ  হওয়া সম্ভব নয়।
হাদীসে কুদসীতে  এসেছে, ” সাওম কেবল আমারই জন্য এবং এর প্রতিদান আমি নিজেই প্রদান করব “। মাহে রমজানে অর্জিত তাকওয়ার এ গুণাবলি মানবজীবনে ধারণ এবং চর্চা করলে  সমাজে বিদ্যমান যাবতীয় অবিচার,  অনাচার অত্যাচার, মারা- মারি, হানা- হানি, প্রতারণা ও অনৈতিকতা, পাশবিকতা  এবং অনৈসলামিক জীবনাচার দূরীভূত হয়ে অনাবিল সুখ- শান্তি, নিরাপত্তা সহ আলোকিত  সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠা হত বা  হয়ে যেত।
ইরশাদ হচ্ছে, ” যদি তোমরাধৈর্য ধারণ করো এবং তাকওযা অবলম্বন করো, তবে, তাদের কোনো ষড়যন্ত্রই তোমাদের কোনে প্রকার ক্ষতি সাধন করতে পারবে না “( সূরা আল- ইমরানঃ১২০)।
আর এই তাকওয়ার সুফল পেতে আমাদেরকে যেমনি ব্যক্তি পর্যায়ে সচেষ্ট হতে হবে, তেমনি সম্মিলিত প্রচেষ্টা বাড়াতে হবে এবং মহান  আল্লাহ তায়ালা  ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর  আনুগত্য ও সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দিতে হবে। ইরশাদ হচ্ছে , ” অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, নিজেদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদূঢ রাখো এবং প্রকৃত ঈমানদার হলে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো ” ( সূরা, আনফালঃ০১)।
মহান আল্লাহ তায়ালার আদেশ- নিষেধ মেনে  এবং তাঁর  প্রিয় হাবীব  দয়াল নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ গ্রহন তথা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুসরন- অনুকরণ জরুরী। কেননা, তাকওয়ার গুণাবলি মানুষকে সবচেয়ে বেশি সম্মানিত করে এবং সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী করে। মহান আল্লাহ তায়ালার নিকটও তাকওয়াবান সম্পন্ন ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি সম্মানিত। সুতরাং দীর্ঘ এক মাসব্যাপী সিয়াম- সাধনার মাধ্যমে অর্জিত তাকওয়ার বলে   বলিয়ান হয়ে আমরা সকলে যেন আলোকিত সোনার মানুষ হতে পারি  মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে  এ প্রার্থনা করছি।
লেখকঃ গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির
সাংবাদিক, কলামিস্ট, সংগঠক
  • শেয়ার করুন

সর্বশেষ খবর

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com