কোটায় বন্দী স্বদেশ | Ekushey Bangla | একুশে বাংলা

কোটায় বন্দী স্বদেশ

কোটায় বন্দী স্বদেশ

রউফুল আলম, পেনসিলভানিয়া (যুক্তরাষ্ট্র) থেকে
কোটা-ব্যবস্থা হলো একটি দরিদ্র রাষ্ট্রকে পঙ্গু করার সর্বোত্তম উপায়। বৈষম্য তৈরির পন্থা। মেধাবী ও যোগ্যদের বাছাইয়ে কোটা কোনো মানদণ্ড হতে পারে না। এই ব্যবস্থা গরিব দেশের অগ্রগতির অন্তরায়। অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত ও দক্ষ করার ব্যবস্থা করতে হয়। পশ্চাৎপদ মানুষদের এগিয়ে নিতে প্রয়োজন হয় বিনা মূল্যে সঠিক শিক্ষা। আর তাদের জন্য কোটা ব্যবস্থা থাকলে, সেটারও নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকবে। শত বছর ধরে এই কোটা ব্যবস্থা চলতে পারে না। কোটা থাকবে প্রতিবন্ধীদের জন্য। কারণ তাঁরা প্রাকৃতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। কোটা থাকা দরকার হিজড়াদের জন্য। কারণ এই লিঙ্গের মানুষগুলো সমাজে নিগৃহীত। সমাজে তারা খুবই অবহেলিত। অথচ তাদের জন্য কোনো কোটা রাখা হয়নি।
আমার পাশের টেবিলের অযোগ্য সহকর্মী যদি বাবার সাহসিকতার সনদ দিয়ে চাকরি পায়, তাহলে আমার কাজের স্পৃহা হ্রাস পাবে। এটা হলো খুবই সাধারণ একটি বিষয়। উন্নত দেশে প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখা হয় কেন? কারণ এতে ‘নেট প্রোডাকটিভিটি’ বাড়ে। টিকে থাকার জন্য সবাই সর্বোচ্চ চেষ্টাটা করে। সমাজের অগ্রগতি হয় দ্রুত।
তা ছাড়া, যে বিষয়ের ওপর আমার হাত নেই, সেটার কারণে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হব কেন! আমার বাবা যদি যুদ্ধ করে থাকেন, সেটা তিনি করেছেন। এ জন্য তিনি সম্মানিত হবেন। আমি যে তার সন্তান, এটা তো আমি নির্ধারণ করিনি। তাঁর বীরত্বের সঙ্গে আমার জন্মের কোনো যোগসূত্র নেই। কারও বাবা যদি যুদ্ধ না করে থাকে, তাহলে সেটা তাঁর বাবার বিষয়। তিনি কেন ক্ষতিগ্রস্ত হবেন? রাষ্ট্র একজন বীরের সন্তানদের খাবারের টাকা দেবে। পড়াশোনার জন্য খরচ দেবে। যোগ্য করার চেষ্টা করবে। বীরের সন্তান বলেই চাকরি দিয়ে ত্রিশ বছরের জন্য বসাতে পারে না। এটা খুবই আন প্রোডাকটিভ!
একটা সমাজ যখন এ ধরনের কাজ বছরের পর বছর করে তখন বৈষম্য বাড়ে। মূল্যবোধ কমে। মিথ্যাচার ও সুযোগ সন্ধানী মানুষের সংখ্যা বাড়ে। দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযুদ্ধ কোটা বহাল রাখায় বহু মানুষ নকল সার্টিফিকেট বানিয়েছে। সে মিথ্যা সার্টিফিকেট দিয়ে সুবিধা নিচ্ছে।
কোটা ব্যবস্থায় কাউকে চাকরি দিয়ে পুনর্বাসিত করার জন্যও নির্দিষ্ট কিছু পেশা থাকে। দেশের সকল পেশায় কোটা ব্যবস্থা প্রয়োগ করা যায় না। যেমন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, প্রশাসনিক ও আইন বিভাগের কর্মকর্তা, হাসপাতালের ডাক্তার—এই সব পেশাগুলো হলো সমাজের ভিত। এই ধরনের পেশায় সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে নিয়োগ দিতে হয়। তাহলে দেশের শিক্ষা, চিকিৎসা ও আইন ভেঙে পড়ে না।
বর্তমান বাংলাদেশে এই তিনটিরই নাজুক অবস্থা। কোটা ব্যবস্থা একটা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য চালু করা হয়। ধীরে ধীরে সেটাকে গুটিয়ে আনতে হয়। অথচ বাংলাদেশে প্রতিটি সরকার এই কোটা ব্যবস্থাকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছে। এক সরকারের চেয়ে অন্য সরকার আরও বেশি কোটা ব্যবস্থা চালু করছে। এতে তাদের ভোট ব্যাংক তৈরি হয়। দুর্বল ব্যবস্থাপনার প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে রাজনীতিতে। ফলে কোনো সরকার আর কঠোর অবস্থানে আসতে পারে না। বরং আরও দুর্বল ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে হয়। কী দুঃখজনক।
উন্নত দেশে কোটা আছে। তবে সেসব দেশে নকল সার্টিফিকেট তৈরির উপায় নেই। কিংবা কোটা দিয়ে একজন অযোগ্যকে চাকরি দেওয়া হয় না। তা ছাড়া শত বছরের জন্য কোটা টিকিয়ে রাখা হয় না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেটা চলে না। সকল পেশার জন্য কোটা প্রয়োগ করা হয় না। কোটা রাখার পেছনে নির্দিষ্ট মেয়াদের একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য থাকে। দুনিয়ার বহু উন্নত সমাজে এখন কোনো কোটা ব্যবস্থাই প্রয়োগ করা হয় না। ইউরোপ-আমেরিকায় তো বহু জাতের কিংবা ধর্মের লোকজন বাস করেন। সেভাবে হিসাব করলে বহু শ্রেণির সংখ্যালঘু সেসব দেশে আছেন। তাই বলে কি তারা কোটা ব্যবস্থা পাচ্ছেন?
বাংলাদেশের বেশির ভাগ মেধাবী ছেলেমেয়ের কোনো কোটা নেই। তাদের কোনো রাজনৈতিক যোগসূত্র নেই। ঘুষ দেওয়ার অর্থ নেই। ফোন করে সুপারিশ করার ক্ষমতাধর মামা নেই। সেসব ছেলেমেয়েরা যখন সঠিক জায়গা থেকে বঞ্চিত হয়, রাষ্ট্রে তখন অভিশাপ নেমে আসে। এটাকে বলে ডিভাইন পানিশমেন্ট—প্রাকৃতিক শাস্তি। যোগ্যরা যখন বঞ্চিত হয় তখন তাদের ভেতর কর্মস্পৃহা ও দেশপ্রেম হ্রাস পায়। সমাজের নেট প্রোডাকটিভিটি কমে যায়। সমাজ পিছিয়ে পড়ে বহুগুণ। আমাদের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রকেরা কি কখনো এটা উপলব্ধি করবেন!
ড. রউফুল আলম: গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া (UPenn), যুক্তরাষ্ট্র।
ইমেইল: rauful.alam15@gmail.com , ফেসবুক: rauful15

ফেসবুক মতামত

সর্বশেষ খবর

WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com