কুমিল্লা পাসপোর্ট অফিসে দালালের 'সিল' ছাড়া ফরম নেন না কর্মকর্তারা | Ekushey Bangla | একুশে বাংলা

কুমিল্লা পাসপোর্ট অফিসে দালালের ‘সিল’ ছাড়া ফরম নেন না কর্মকর্তারা

কুমিল্লা পাসপোর্ট অফিসে দালালের ‘সিল’ ছাড়া ফরম নেন না কর্মকর্তারা

মোঃ পলাশ হোসাইন , স্টাফ রিপোর্টার

কুমিল্লা জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জালাল উদ্দিন আহম্মেদ দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে পাসপোর্ট নবায়নের ফরম জমা দিতে গেলে অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলে দেন ‘বাইরের লোক (দালাল) দিয়া জমা দেন’। এমন কথা শুনে রেগে জালাল উদ্দিন সোজা উঠে যান পাসপোর্ট ভবনের দোতলায়, উপপরিচালকের কক্ষে। নিজে নিজে ফরম পূরণ, ব্যাংক চালান, সংশ্নিষ্ট কাগজপত্রসহ সবকিছু সংযোজন করেই তিনি উপপরিচালক রাজ আহমেদের সঙ্গে কথা বলতে যান। দালালের ‘সিল’ না থাকায় বিরক্ত হন উপপরিচালক। বলে দেন পাসপোর্ট পেতে সময় লাগবে তিন মাস। জালাল উদ্দিন তাকে উদ্দেশ করে বলেন, সরকারি তিন হাজার ৪৫০ টাকার জায়গায় সাড়ে ৫ হাজার টাকা দিলেই দালাল পাসপোর্ট দিয়ে দেয় ২১ থেকে ৩০ দিনে। আর আপনি বলছেন তিন মাস সময় লাগবে। এতে রেগে যান উপপরিচালক। শুরু করেন দুর্ব্যবহার। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে উপপরিচালক পকেট থেকে অতিরিক্ত দুই হাজার টাকা বের করে দিতে উদ্যত হন। বলেন, ‘এখানে দালাল-ফালাল নেই। আমি ওই অতিরিক্ত টাকা দেই। আপনি পাসপোর্ট করিয়ে আনেন।’ তর্কাতর্কির এই পর্যায়ে কক্ষ থেকে বের হয়ে যান জালালউদ্দিন।

জালাল উদ্দিন জানান, প্রতিবাদ করায় উল্টো তিনি হয়রানির শিকার হয়েছেন। তার পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে ৫৯ দিনে। ১১ জুন পাসপোর্ট ইস্যু হলেও অযথাই দেরি করে ৯ দিন পর ২০ জুন তাকে পাসপোর্ট দেওয়া হয়।

উপপরিচালক রাজ আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগের এখানেই শেষ না। কুমিল্লা জিলা স্কুলের দুই শিক্ষক গত সপ্তাহে তার দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন। গণিতের শিক্ষক কামাল উদ্দিনকে ধাক্কা দিয়ে কক্ষ থেকে বের করে দেন উপপরিচালক। তার সরকারি (অফিসিয়াল) পাসপোর্ট ছিল। সব কাগজপত্র থাকার পরও তিনি নবায়ন করতে বাধ্য হয়েছেন সাধারণ পাসপোর্টে। এখনও তা হাতে পাননি। তার সঙ্গে যাওয়া অপর রসায়নের শিক্ষক তোফায়েল আলম নতুন পাসপোর্ট করতে গিয়েছিলেন। তাকেও সাধারণ পাসপোর্ট আবেদনেই বাধ্য করা হয়েছে।

আগে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন দেবিদ্বারের মাহবুবুর রহমান। এখন বেকার। তিনি উপপরিচালকের বিরুদ্ধে ২২ সেপ্টেম্বর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে। মাহবুবুর রহমান সমকালকে জানান, ১৬ সেপ্টেম্বর তিনি পাসপোর্ট নবায়ন করতে লাইনে দাঁড়ান। চার-পাঁচ ঘণ্টা পর কাউন্টারে পৌঁছালে কর্তব্যরত কর্মকর্তা মোশারফ হোসেন আবেদন ফরমের উভয় পাতা পূরণ করে আবার আসতে বলেন। পরদিন আবার জমা কাউন্টারে গেলে একই কমকর্তা ফরম পূরণ সঠিক হয়নি অজুহাতে তাকে ‘বাইরের লোক আছে, তাদের কাছে যান’ এমন পরামর্শ দিয়ে বিদায় করে দেন। পরদিন সঠিকভাবে ফরম পূরণ করে গেলে জন্মনিবন্ধনের অনলাইন কপি নিয়ে আবার আসতে বলেন। তিন দিন পর ২২ সেপ্টেম্বর অনলাইন কপি নিয়ে জমা দিতে গেলে কর্তব্যরত কর্মকর্তা সহিদুল ইসলাম ‘বাইরের লোক মারফত জমা দিতে বলেন’। তিনি বলেন, আমি অসহায় হয়ে উপপরিচালকের সঙ্গে দেখা করে অভিযোগ শুরু করা মাত্রই তিনি রেগে গিয়ে আমাকে কক্ষথেকে বের হয়ে যেতে বলেন। আল আমিন নামের এক ব্যক্তি জানান, জরুরি পাসপোর্টে সরকারি ফি সাড়ে ৬ হাজার টাকা। তিনি ২৯ আগস্ট সাড়ে ১০ হাজার টাকায় দালালের মাধ্যমে জরুরি পাসপোর্টের আবেদন করেন। ২২ সেপ্টেম্বর তিনি কোনোরকম হয়রানি ছাড়াই পাসপোর্ট গ্রহণ করেন। সুব্রত চক্রবর্তী নামে আরেক ব্যক্তি জানান, তিনি দালালের মাধ্যমে পাঁচ হাজার  ৭০০ টাকা জমা দিয়ে ২৩ দিনে ঝামেলা ছাড়াই পাসপোর্ট হাতে পেয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাসপোর্ট অফিসের পাশেই শাহাজাদী-সুভারতী উচ্চ বিদ্যালয়। দু’পাশের মার্কেটে রীতিমতো অফিস খুলে বসেছেন দালালরা। সব ধরনের পাসপোর্ট আবেদনে তারা অতিরিক্ত নেন দুই হাজার টাকা বা তার বেশি। এর মধ্যে চার থেকে ৫০০ টাকা পান দালালরা। ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা দিতে হয় পাসপোর্ট অফিসকে। একই পরিমাণ টাকা পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় দিতে হয় পুলিশ প্রতিবেদনের জন্য। এভাবেই ‘নিয়ম মেনে’ চলছে পাসপোর্ট প্রদান। অধিকারকর্মী আইনজীবী আনিসুর রহমান মিঠু বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই চলছে। পাসপোর্ট আবেদন ফরম পূরণ করাও কিছুটা জটিল। প্রয়োজনে দালালদের আইনের আওতায় এনে ফি নির্ধারণ করে দিয়ে তাদের সেবাকে বৈধ করে নেওয়া যেতে পারে। এতে হয়রানি-ভোগান্তি কমবে।

সম্প্রতি দুই দফা অভিযানে বেশকিছু দালালসহ ১৩ জনকে গ্রেফতার ও বিভিন্ন মেয়াদে জেল-জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমাণ পাসপোর্ট, সিল, ভুয়া সনদ ও কাগজপত্র।

অভিযোগের বিষয়ে উপপরিচালক রাজ আহমেদ বলেন, ‘যোগদানের ১৫ দিন থেকে প্রথম মাসেই আমার পাগল হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এক বছর হয়েছে কুমিল্লা এসেছি। মৌখিক অভিযোগের শেষ নেই। সবার সেবা দিতে গিয়ে আমি ৪টার পর দুপুরের খাবার খাই। সবার কথা শুনি, কাজ করে দেওয়ার চেষ্টা করি।’ অভিযোগের বিষয়ে গোপনে তদন্ত করারও আহ্বান জানান তিনি। লা প্রশাসক আবুল ফজল মীর বলেন, পাসপোর্ট অফিসে হয়রানির বিষয়ে একজন সেবাগ্রহীতা অভিযোগ করেছেন। অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

 

ফেসবুক মতামত

সর্বশেষ খবর

WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com