কুমিল্লার জনপ্রিয় কবি : ফখরুল হুদা হেলালের ৬৬তম জন্মদিন

কুমিল্লার জনপ্রিয় কবি : ফখরুল হুদা হেলালের ৬৬তম জন্মদিন

কুমিল্লার সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের পরিচিত মুখ পাঠক প্রিয় কবি ফখরুল হুদা হেলালের জন্ম দিন উপলক্ষে কবি’র কাছ থেকে কিছু জানার ও কিছু লেখার ইচ্ছা থেকে কবি’র মুখোমুখি হই। কবি ফখরুল হুদা হেলাল একজন কবি, সংগঠক ও নাট্যাভিনেতা। তিনি আজ কুমিল্লার গন্ডি পেরিয়ে অবাধ বিচরণ করে চলেছেন দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভূবনে। কুমিল্লার সংস্কৃতির অঙ্গনে উজ্জ্বল নক্ষত্র কবি, সংগঠক ও নাট্যাভিনেতা ফখরুল হুদা হেলাল ১৯৫৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর মামার বাড়ী চাঁদপুর জেলার মতলব উপজেলাধীন একলাশপুর ঢালী বাড়ী (মিঞা বাড়ী)’তে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার শশই ইসলামপুর ডেপুটি বাড়ী(মিঞা বাড়ী)। বাবা প্রয়াত এবিএম আইনুল হুদা,মাতা প্রয়াত মর্জিনা বেগম। কবি’র দুই ভাই, দুই বোন। এক ভাই বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা অন্য ভাই বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক ও সু-বক্তা। স্ত্রী প্রয়াত ফাতেমা আক্তার পারভীন ২০১৩’তে কবি কে ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমান। আমরা কবি পরিবারের প্রতি দোয়া ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি। ফখরুল হুদা হেলাল শুধু কবি হিসেবে নয়, একজন সংগঠক ও নাট্যাভিনেতা হিসেবেও বেশ পরিচিত। চলনে বলনে রাজা-বাদশার ভাব। চুলগুলোও ঝাঁকড়া-বাবরী দোলানো, চোখ আর বিশাল দেহের অধিকারী কবি’কে একবার দেখলে দীর্ঘ দিন মনে রাখার মতো। ইতিমধ্যে কবির ৮টি কাব্য গ্রন্থ বের হয়েছে। প্রথম কাব্য গ্রন্থ “অনামিকায় প্রবাল” এবং সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ “তোমাদের জন্য কবিতা”। তিনি শুধু কবিতাই লেখেন না, নাটকেও কাজ করেছেন এমনকি তিনি একজন ভালো সংগঠকও বটে। জাতীয় ভিত্তিক সংগঠন “কবিতা বাংলার” কুমিল্লা শাখার আহবায়ক, কুমিল্লা কবি ফোরামের প্রধান উপদেষ্টা, (ত্রিধারা) শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি,সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট কুমিল্লা,রেঁনেসা নাট্যগোষ্ঠী, প্রগতি নাট্যগোষ্ঠী,নবাব ফয়জুন্নেছা ফাউন্ডেশন,নিরাপদ চালক চাই সংগঠনের উপদেষ্টা এবং বাংলা একাডেমী, রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির কুমিল্লা ইউনিট,কুমিল্লাস্থ ব্রাহ্মণবাড়ীয়া সমিতি,নজরুল পরিষদ-কুমিল্লা,কুমিল্লা কালচারাল কমপ্লেক্স জীবন সদস্য এছাড়া জেলা শিল্পকলা একাডেমী,কুমিল্লা টাউন হলের সদস্য।
কবি’র অভিনয় জীবনের স্মৃতি কথা: অভিনয় জীবনে যাদের সঙ্গে অভিনয় করেন,বাংলা চলচিত্র জগতের প্রবাদ পুরুষ অভিনেতা আনোয়ার হোসেন,অভিনেত্রী আনোয়ারা,কৌতুক অভিনেতা সাইফুদ্দিন আহমেদসহ জুলিয়া,নার্গিস ও শুভ্রা। ১৯৭৭ সালে “অভিশপ্ত প্রেম” নাটকে অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরষ্কার অর্জন করেন। কবি’র জন্ম দিনে সেই সময়ের সুখময় স্মৃতিগুলো জেনে নেই, ১৯৭৬-৭৭ কুমিল্লা টাউন হলে মঞ্চস্থ হবে নাটক “নবাব সিরাজউদ্দোল্লা। কবি’র রিহার্সেল হল টিকে গেল। মীর জাফরের ছেলে মীরন চরিত্রে। তখনকার জেলা মৎস্য অফিসার প্রয়াত নুরুল ইসলাম ছিলেন আয়োজক ও পরিচালক। প্রগতি নাট্য সংঘের ব্যানারে এই নাটকে অভিনয় করতে ঢাকা থেকে এসেছিলেন অভিনেতা আনোয়ার ও অভিনেত্রী আনোয়ারাসহ অনেকে। পায়জামা-পাঞ্জাবী বাটার সেন্ডেল প্রয়োজনে নাগরা পড়তেন কবি হেলাল। নাটকের রিহার্সেল হচ্ছে আলেয়া চরিত্রে আনোয়ারার সঙ্গে কবি’র। তিনি বার বার ডায়লগ ও অভিনয়ে ব্যর্থ হচ্ছে। আনোয়ারার চোখ ছিল বেশ বড়-আমার চোখ তার দিকে তাকালেই ফিরে আসে; একপর্যায়ে আনোয়ারা আমাকে কাছে টেনে বললেন হেলাল-আপনি আমাকে এভাবে ধরুন এবং ডায়লগ বলুন। তারপর আমি তাই করলাম এবং সফল হলাম।
কবি’র ভাষায় আরেকটি ঘটনা : নবাবের চরিত্রে অভিনয় করবেন অভিনেতা আনোয়ার হোসেন,তারপায়ে নাগরা জুতা লাগবে। পরিচালক নাগরা আনার জন্য লোক পাঠালেন দেরি হওয়াতে হৈ চৈ অর্থাৎ বেশ গন্ডগোল শুরু হল,তখন আমার পায়ে নাগরা ছিল। আনোয়ার ভাই বললেন,হেলাল তোমার নাগরা গুলো দাও আমি খুলে দিলাম। কি আশ্চার্য্য! নাগরা গুলো তার পায়ে লেগে গেল এবং রিহার্সেল শেষ হল। তার জন্য আনা নতুন নাগরা তিনি আমাকে দিয়ে বললেন,একদিন তুমি খুব ভালো নাট্য অভিনেতা হবে। তোমার পুরান নাগরা পরেই-আমি অভিনয় করব।
কবি এ পর্যন্ত যে সব সম্মানে ভূষিত হয়েছেনঃ- সম্মাননা স্মারক-কুমিল্লা জনান্তিক, অভিনন্দন স্মারক-বীরচন্দ্র গণপাঠাগার ও নগর মিলনায়তন,কবিতায় স্বীকৃতি স্বরূপ-কবি সংসদ, কুমিল্লা শাখা, বৈশাখী সম্মাননা কুমিল্লা- মহান স্বাধীনতা এ জাতীয় দিবস সম্মাননা-২০১২, স্বদেশ সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশন ঢাকা, কবি সম্মেলন সম্মাননা-রাইটাস ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, মহাকবি মাইকেল মধুসুদন দত্ত স্মৃতি পুরষ্কার-লেখক সাংবাদিক ঐক্য ফাইন্ডেশন ঢাকা, অভিনন্দন-সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট কুমিল্লা, শ্রেষ্ঠ শাখা ক্রেষ্ট-কবিতা বাংলা কুমিল্লা শাখা, কবি সুকান্ত ভট্টচার্য স্বর্ণপদক-২০১৩,ইউনাটেড মুভমেন্ট হিউম্যান রাইটস ঢাকা।
আমার কথা: আমি কবি ফখরুল হুদা হেলালের কবিতার একনিষ্ট ভক্ত। তার লেখা কবিতা আমাকে মোহাচ্ছন্ন করে। বিশাল দেহের অধিকারী কুমিল্লার হাতে গুণা কবিদের মধ্যে প্রথম সারির এই মানুষটি সঙ্গে দেখা করার,কথা বলার, আকুলতা ব্যাপক ছিল। কিন্ত তাঁর সাথে দেখা বা কথা বলা কি সম্ভব। আমার কল্পনা ও আকুলতা এক সময় বাস্তবে রূপলাভ করে। ২০০৫ সালে দৈনিক আমার দেশ “পাঠকমেলা” কুমিল্লা জেলা কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হয়ে প্রথমে আমি উদ্যোগ নেই উপদেষ্টা কমিটি গঠনের। সেই সুবাদে কবি ফখরুল হুদা হেলালের সান্নিধ্যে যাবার সুযোগ তৈরী হয়। আমি কয়েকজনকে নিয়ে এক বিকালে তার বাসায় যাই। কবি’র বাসায় যাওয়া পর্যন্ত তার কাছে আমরা অপরিচিত। যাওয়ার পর আমরা যখন আমাদের পরিচয় দেই তখন তার আন্তরিকতা, হৃদয়তায় আমাদের মন মুগ্ধতার আবেশে ভরে যায়। তিনি আমাদের সাদরে গ্রহণ করেন। কবি’র আন্তরিকতাপূর্ণ ব্যবহার যেন আমরা তার নিকটাত্মীয় বা কত দিনের চেনা আপনজন। কবি’র সঙ্গে প্রায় দুই ঘন্টা প্রানবন্ত আড্ডা,চা ও বিস্কুট দিয়ে কবি পত্মীর আপ্যায়ন ভুলার নয়। পরিশেষে ফেরার পথে সবাইকে তার লেখা বই উপহার দেন। ঐ দিনের বৈঠকে আমার দেশ পাঠকমেলা কুমিল্লা জেলা কমিটির উপদেষ্টা সদস্য মনোনীত হয় কবি হেলাল।
তিনি অসংখ্য লিটল ম্যাগাজিন বের করেছেন এবং কুমিল্লা নগরীর প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে তার সরস উপস্থিতি লক্ষ্য করেছি। তিনি চান, দেশের মানুষ সব সময় হাসি খুশি থাক, সুখী জীবন যাপন করুক এবং সাদামাটা জীবন হলেও স্বপ্ন ও ভালোবাসায় থাকুক সজিব। তিনি নিজ ধর্ম ও সম্প্রদায়ের বৃত্তে অবস্থান করেও সত্য সুন্দরের পথচারি থেকে-মনুষ্যত্ব,মানবপ্রেম, ভালোবাসা ও প্রীতিমাখার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। পাশবিকতা পরিহার করে বিশ^জনীন মানবতা প্রতিষ্ঠা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার একজন প্রগতিশীল মানুষ কবি ফখরুল হুদা হেলাল। আগামী ১লা সেপ্টেম্বর রবিবার বিকেল ৫টায় কুমিল্লা কান্দিরপারস্থ টাউন হল মুক্তিযুদ্ধ কর্ণারে জন্মবার্ষিকী উদযাপন কমিটি আয়োজনে ও কুমিল্লা কবি ফোরাম এর সহযোগিতায় কবি’র ৬৬তম জন্মদিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা,কবিতা পাঠ, কেককাটা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

লেখক: গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির ,সাংবাদিক,কবি ও কলামিষ্ট,কুমিল্লা।

  • শেয়ার করুন
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com