‘কিং মেকার’ প্রশান্ত কিশোর: ভোটে জিততে যার দ্বারস্থ হন মোদি-মমতারা

‘কিং মেকার’ প্রশান্ত কিশোর: ভোটে জিততে যার দ্বারস্থ হন মোদি-মমতারা

টানা তৃতীয়বারের মতো পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় বসছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। তার এই ভূমিধস বিজয় নিয়ে চলছে চুলচেড়া বিশ্লেষণ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ’র মরিয়া প্রচেষ্টার পরও বিজেপিকে কাঁচকলা দেখিয়ে তৃণমূলের এই বিজয়ের পেছনে শুধুই মমতার ব্যক্তিগত কারিশমা প্রধান ভূমিকা রেখেছে? নাকি আরও কিছু ছিল? ভারতের সংবাদমাধ্যমের পর্যবেক্ষণ বলছে, শুধু মমতার বিচক্ষণতা নয় এমন জয়ের পেছনে দারুণ ভূমিকা রেখেছেন নির্বাচনের আগে তৃণমূলের পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া প্রশান্ত কিশোরের কৌশলও। মমতাকে টানা তৃতীয়বারের মতো মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসানোর একজন ‘নেপথ্য নায়ক’ তিনি। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন সামনে রেখে প্রশান্ত কিশোরকে নিয়োগ করেছিলেন দলের পরামর্শক হিসেবে। দায়িত্ব নেওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসকে জেতানোর জন্য কাজ শুরু করেন প্রশান্ত। মমতাকে নিত্যনতুন পরামর্শ দিয়ে তৃণমূলকে এগিয়ে নেন। মমতাকে দিয়ে নতুন নতুন প্রকল্পের ঘোষণা করে কার্যত তার জয়ের পথকে প্রশস্ত করে তোলেন। এছাড়া অপ্রকাশিত নানা কৌশল তো রয়েছেই। ফলাফল হাতেনাতেই পেলেন। এরপর থেকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে প্রশান্ত কিশোর। কিন্তু কে এই প্রশান্ত কিশোর? তার জন্ম বিহারের রোহতাস জেলার কোরান গ্রামে। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর তার বাবা পাকাপাকিভাবে চলে যান বিহারেরই বক্সারে। অন্য দিকে ইঞ্জিনয়ারিংপড়তে হায়দরাবাদে যান প্রশান্ত। পড়াশোনার পাঠ চোকানোর পর কাজে যোগ দেন রাষ্ট্রপুঞ্জের স্বাস্থ্য বিভাগে। কর্মস্থল ছিল আফ্রিকা। আট বছর চাকরির পর ২০১১ সালে ফিরে যান ভারতে। তৈরি করেন নিজের সংস্থা সিটিজেন্স ফর অ্যাকাউন্টেবল গভর্নমেন্ট (সিএজি)। নিজের সংস্থায় নিয়োগ করেন আইআইটি-আইআইএম-এর পেশাদার লোকজনকে। পরের বছরই গুজরাটের বিধানসভা নির্বাচনে জেতার পথ বাতলে দেন নরেন্দ্র মোদিকে। তারপর প্রধানমন্ত্রী হতেও প্রশান্তের ওপর ভরসা করেন মোদি। সেসময়ই প্রশান্তের মস্তিষ্ক থেকে বেরোয় ‘চায়ে পে চর্চা’, ‘রান ফর ইউনিটি’র মতো ‘মাস্টার স্ট্রোক’। আর সেই সবের হাত ধরেই দেশ জুড়ে বিপুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন মোদি। ফল ২০১৪ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রীর পদে উত্তরণ। এরপর নিজের সংস্থা সিএজি পরিবর্তন করে গড়ে তোলেন ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি (আইপিএসি)। এর মধ্যেই ২০১৫ সালের গোড়ায় যোগ দেন নীতীশ কুমারের রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজিস্ট হিসেবে। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হন নীতীশ কুমার। পরে প্রশান্তের হাত ধরে কংগ্রেস। প্রথমেই দায়িত্ব পান ২০১৬ সালের পাঞ্জাব বিধানসভা নির্বাচনের। সেবার ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিংহের জয় নিশ্চিত করার কারিগর ছিলেন এই ‘পিকে’ই। পরের বছরই উত্তরপ্রদেশ বিধানসভার নির্বাচনে ব্যাকফুটে চলে যান প্রশান্ত। জেতাতে পারেননি কংগ্রেসকে। তারপরই অন্ধ্রপ্রদেশে ওয়াইএসআরসিপির জগনমোহন রেড্ডিকে জয় এনে দেন তিনি। ২০১৯ সালের জুনে মোটা অংকের অর্থে নিয়োগ দিয়ে এই ‘জাদুকর’র সামনে মমতা ‘মিশন’ হিসেবে দেন ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন। প্রশান্ত কিশোরকে বলা হয়, মোদির ‘জাদু’ থামাতে হবে, ‘পাল্টা জাদু’ দেখাতে হবে ২০২১ সালের ভোটে। তিনি দেখালেনও; ২০০’র বেশি আসনে জিতল তৃণমূল। আত্মবিশ্বাসী প্রশান্ত কিশোর ২০২০ সালের ২১ ডিসেম্বর টুইটে লিখেছিলেন, বাস্তবে দুই সংখ্যা পার করতে কসরত করতে হবে বিজেপিকে। টুইটটি সেভ করে রাখুন। এর চেয়ে বেশি আসন পেলে পেশা ছেড়ে দেব।’ রোববার প্রশান্ত কিশোরের ভবিষ্যদ্বাণী ফলতেই পুরনো টুইট পিন টু টপ করে রাখলেন তিনি। আবারও মনে করালেন পুরনো কথা। বিজেপিকে নিয়ে করা ভবিষ্যৎদ্বাণী মিলে গিয়েছে। কিন্তু চ্যালেঞ্জ জিতেও পেশাবদলের ঘোষণা প্রশান্তের! তৃণমূলের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর একটি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আমি যেই কাজ করছি তা আর চালিয়ে যেতে চাই না। যথেষ্ট কাজ করেছি। এখন সময় এসেছে বিরতি নেওয়ার এবং জীবনে অন্য কিছু করার। আমি এই জায়গাটি ছাড়তে চাই। 
কেন এই পেশায় আর থাকতে চান না সে বিষয়টি স্পষ্ট করেননি তিনি। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি তিনি ফের রাজনীতিতে যোগ দেবেন? উত্তরে প্রশান্ত জানান, আমি একজন ব্যর্থ রাজনীতিবিদ। আমাকে ফিরে যেতে হবে এবং আমাকে কী করতে হবে তা দেখতে হবে। ফুরফুরে মেজাজে প্রশান্ত এও জানালেন, আসামে পরিবারের কাছেই ফিরে যাবেন তিনি। চা-বাগানের কাজ করবেন! এরপর নতুন কী খেল নিয়ে আসছেন ‘পিকে’ সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা। 

সুত্রঃ যমুনা টিভি

  • শেয়ার করুন
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com