কবি ও কবিতার মানুষ ফখরুল হুদা হেলাল | Ekushey Bangla | একুশে বাংলা

কবি ও কবিতার মানুষ ফখরুল হুদা হেলাল

কবি ও কবিতার মানুষ ফখরুল হুদা হেলাল

যিনি প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সৌন্দর্য্য এবং মানুষের সুখ-দুঃখ,হাসি-কান্না,আনন্দ-বেদনার চিত্র আপন হৃদয়ে ধারণ করে লিখনির মাধ্যমে প্রকাশ করে তাকে কবি বলা হয়: তিনিই কবিতার মানুষ। এই লেখার মধ্যেই নিজের সর্বসত্তা নিয়োজিত করে দেশ ও জাতির বিভিন্ন কর্মকান্ড এবং ধর্ম-বর্ণের কৃষ্টি কালচার চিত্রায়িত করেন মনের মাধূঁরী মিশিয়ে। নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করে যায়-জীবনের অন্তিমকাল পর্যন্ত। কবিতা লেখার নেশায় যখন মত্ত হয়; তখন ভুলে যায় নাওয়া-খাওয়া, স্ত্রী-সন্তান,পরিবার-পরিজন। এই নেশা যাকে একবার পেয়ে বসেছে-তাকে সর্বশান্ত না করে ছাড়েনি। কেউ তো আবার ঘর-বাড়ী ছেড়েছে-কবিতার জন্য। কবিতার প্রেম: বড়ই কঠিন প্রেম, ছাড়তে চাইলেও ছাড়া যায় না; ভুলতে চাইলেও ভুলা যায় না। কি অদৃশ্য শক্তি এর মধ্যে কাজ করে- তার হদিস পাওয়া যায় না। মনে হয় চুম্বক জাতিয় কোন প্রকার শক্তি রয়েছে-যা নিজের দিকে সব সময় আকর্ষণ করতে থাকে। যাদের মধ্যে কবিত্ব শক্তির আর্বিভাব হয়েছে; তাদের অধিকাংশের জীবন কেটেছে অনেক দুঃখে-কষ্টে। লোভহীন জীবন-যাপনই তাদের দুঃখ-কষ্টের একমাত্র কারণ। ব্যক্তিগত জীবনে দুঃখ-কষ্ট যতই থাকুন না কেন-কবিত্ব শক্তি অর্জনকারীরা কখনো সেই দুঃখ-কষ্টে ভেঙ্গে পড়ে না; অন্যায় ও অবিচার এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে নির্দ্বিধায় যুদ্ধ ও সংগ্রাম চালিয়ে যায়। একমাত্র কবিত্ব শক্তিই তাদের মূলমন্ত্র-যার উপর ভর করে জীবনের পড়ন্ত বেলা পর্যন্ত মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে ধরিত্রীর বুকে। কবিতাই যার প্রেম, যার ভালোবাসা-তাকে তো অন্যকিছুতে মোহিত করা যায় না। অন্য কোন কিছুইতে সে আত্মতৃপ্তি পায় না।
এমনই একজন কবিতার মানুষ ফখরুল হুদা হেলাল। তিনি একাধারে কবি ও সংগঠক এবং নাট্যভিনেতা। অসংখ্য কবিতার লেখার পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন অনেক সংগঠন। অভিনয় করেছেন বিভিন্ন মঞ্চ নাটকে। তিনি দেশের সাহিত্যে ও সংস্কৃতির অঙ্গনে মিশে আছেন-তার সৃষ্টিশীল কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে। সাহিত্যরতœ এই কবির পৈত্রিক নিবাস ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার শশই ইসলামপুর ডেপুটি বাড়ী হলেও তিনি ১৯৫৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর মামার বাড়ী চাঁদপুর জেলার মতলব উপজেলার একলাশপুর ঢালী বাড়ীতে জন্মগ্রহন করেন।
বাবরী দোলানো চুলের বিশাল দেহের অধিকারী কবি যৌবনে রাজা-বাদশার ভাব নিয়ে চলা ফেরা করতেন। দুই হাতে লিখতেন কবিতা। একে একে ৮টি কাব্য গ্রন্থ প্রকাশ করেন। তার প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ “অনামিকায় প্রবাল” এবং শেষ কাব্যগ্রন্থ “তোমার জন্য কবিতা”। কবিতা লেখা ছাড়াও তিনি বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত থেকে সাহিত্য ও সংস্কৃত অঙ্গনে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি “কবিতা বাংলার” আহবায়ক,কুমিল্লা কবি ফোরামের প্রধান উপদেষ্টা, ত্রিধারা শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, সম্মিলিত সাংস্কৃতি জোট কুমিল্লা, রেঁনেসা নাট্যগোষ্ঠীর সভাপতি, রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি কুমিল্লা ইউনিটসহ বিভিন্ন সংগঠনের সাথে আজও সময় দিয়ে যাচ্ছেন।
তার এই কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ বিভিন্ন সংগঠন থেকে পেয়েছেন স্মারক ও সম্মাননা। তার মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হলো- সম্মাননা স্মারক-কুমিল্লা জনান্তিক, অভিনন্দন স্মারক-বীরচন্দ্র গণপাঠাগার ও নগর মিলনায়তন, কবি সংসদ,বৈশাখী সম্মাননা, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস সম্মাননা-২০১২,স্বদেশ সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশন ঢাকা, কবি সম্মেলন সম্মাননা, রাইটাস ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, মহাকবি মাইকেল মধূসুদন দত্ত স্মৃতি পুরষ্কার, লেখক সাংবাদিক ঐক্য ফাউন্ডেশন ঢাকা, অভিনন্দন-সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট কুমিল্লা, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য স্বর্ণপদক-২০১৩।
আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ শরতীর প্রকাশনা উৎসবে প্রথম কবি ও নাট্যভিনেতা ফখরুল হুদা হেলালের সাথে সাক্ষাত হয়। তারপর থেকে মোটামোটি একটা যোগাযোগ রয়েছে। বিশেষ করে লেখক ও সংগঠক গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবিরের সূত্র ধরেই এই গুণি কবি’র সাথে আমার পরিচয়ের সূত্রপাত ঘটে। এছাড়া এডভোকেট মোঃ জাফর আলীর কথা ভুলে গেলে চলবে না। জাবির ও জাফর আলী কবি ফখরুল হুদার অত্যন্ত কাছের মানুষ। আমার জানা মতে তাদের মধ্যে খুবই মধূর সর্ম্পক রয়েছে। আমার সাথে তত একটা ঘনিষ্ঠ সর্ম্পক হয়নি। তবে ইদানিং দৈনিক একবার হলেও অগ্রজ এই কবি’র সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ হয়। হয়তো বা তিনি ফোন করেন অথবা আমি ফোন করি। তবে তিনিই বেশি খোঁজ-খবর নেন-একজন অভিভাবকের মতো। কবিতাঙ্গনের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রের নিকট আমি ক্ষুদ্র এক ধূলি কণামাত্র; তবু ক্ষুদ্র ধূলি কণার প্রতি তার রয়েছে আন্তরিক ভালোবাসা। এই ভালোবাসার প্রতিদান দেওয়ার মতো আমার কিছুই নেই। আমিও একজন অর্কমা, ভবঘুরে, দায়িত্ব জ্ঞানহীন,মূল-কান্ডবিহীন মানুষ। জিবন-জীবিকার তাড়না সৃষ্টি হয় না; স্ত্রী-সন্তানদের চাহিদা পূরণের জন্য ছোট একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছি। মাঝে মাঝে মনে হয় সব ছেড়ে-চলে যাই দূর কোন অজানার দেশে। যেখানে থাকবে না কোন চাহিদা, থাকবে না কোন জন-মানবের কোলাহল; পাখিরা গান গাইবে আপন মনে। ঝর্ণা থেকে কল কল করে নির্মল জল রাশি প্রবাহিত হবে। সবুজের সমারোহে এবং সবুজের রাজ্যের অধিপতি হয়ে থাকব ধ্যান মগ্ন হয়ে। এসবই কোন কল্প জগতের কল্পকাহিনী-যদিও আমার হৃদয়ের কথা এগুলো; মগজে উৎপাদিত চিন্তা শক্তির একটি অংশ বিশেষ। জাগতিক জীবনে এসবের কোন মূল্য নেই; মূল্যহীন এই জীবনটাকে নিয়ে খুবই আনন্দ উপভোগ করি কিন্ত যখন সংসারের দিকে তাকাই; তখন অবশ্য হায়-হুতাশে মধ্যে হাবু-ডুবু খাই। কি এক জরাজীর্ণ জীবন অতিবাহিত করছি! লোকে তাই বলে। লেখালেখি করে কি হবে? ছেড়ে দাও-ও সব! কাজে কামে মন দাও। কিন্ত কেউ তো বুঝতে পারছে না অথবা উপলব্ধি করতে পারছে না- আমি তো আমার কাজই করে যাচ্ছি। কারণ লেখালেখি করাটাই আমার প্রকৃত কাজ-বিধির বেঁধে দেওয়া।
যৌবন বয়সে সকলকে তাক লাগানো কবি ফখরুল হুদা হেলাল আজ বয়সের শেষ প্রান্তে এসে উপনিত হয়েছে। চির সঙ্গিনীটাকে হারিয়ে আজ একাকী জীবন যাপন করছে। দেখলে মনে হয় চিরহরিৎ বৃক্ষটি আজ কেমন যেন নুয়ে পড়েছে। শাখা-প্রশাখার পত্র-পল্লবগুলো ঝড়ে পড়ে নিঃস্ব ও সর্বশান্ত হয়ে আছে। যশ খ্যাতির কমতি না থাকলেও সঙ্গ দেওয়ার মতো কেউ নেই। নিঃসঙ্গতা ক্রমান্বয়ে তাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে।
তবে সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো- বিগত ৬৬ বছর ধরে যে কুমিল্লার রাস্তা-ঘাট, আলো-বাতাস, ধূলিকণার সাথে মিশে আছে এবং জীবনের সর্বকিছু বিলিয়ে দিয়েছে-এই কুমিল্লারই মাঝে কিন্ত তার থাকার নিবাস বলতে কিছুই নেই। ভাড়াকৃত ছোট একটি নির্জন কক্ষে দিনাতিপাত করতে হয়। ছেলে সন্তান বলতে কেউ নেই-শুধুমাত্র রিক্ত হস্তের একজন কবিতার মানুষ, সাধনার মানুষ হয়ে বেঁচে আছেন-এটাই একমাত্র সান্ত¡না। কবিতা পাগল,সংগঠন প্রিয় এই মানুষটির প্রতি একটু দৃষ্টিপাত দেওয়া উচিত; যেন তিনি শেষ বয়সে আত্মতৃপ্তি উপলব্ধির মধ্যে সময়টুকু কাটাতে পারেন। কবি ও কবিতার মানুষ ফখরুল হুদা হেলাল ভাইয়ের জন্য এক খন্ড জমি বরাদ্ধ দিয়ে তার জন্য ছোট একটি নিবাস গড়ে দিতে কুমিল্লার প্রশাসনের দৃষ্টি আর্কষণ করছি। যেখানে তিনি শেষ বয়সে কবিতা আড্ডা দিয়ে, গল্পের আসরের মাধ্যমে চিত্র-বিনোদন করে কাটাতে পারেন। তার নিজের বলতে তো আর কিছুই নেই; আছে শুধু পাঠকদের ভালোবাসা।
তিনি একান্ত আলোচনায় তার ভাড়াকৃত ছোট কক্ষে আমাকে বলেন-শরীরটা বেশি ভালো যাচ্ছে না। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে আছেন। মনের শক্তি আর কবিত্ব শক্তিই তাকে টিকিয়ে রেখেছে। কবিতা অনেকেই পছন্দ করেন কিন্ত কবিতার কারিগরকে কেউ সহযোগীতা করে না। কবিতের জীবন মনে হয়-এমনই হয়। খেজুর গাছের মতো। শীতকালে খেজুরের রস কে না ভালোবাসে কিন্ত সেই রসটা সংগ্রহ করা হয়; গাছের গলা কেটে। প্রকৃতপক্ষে যারা সাহিত্যে সাধনায় মত্ত হয়-তাদের অধিকাংশরাই নিজের গলা কেটে, অন্তরের সকল রশ্মিগুলো ছিন্ন ভিন্ন করে; মগজটাকে ধবংস করে নির্যাসটাকে দিয়ে যায়- জাতির কল্যাণে।

ফেসবুক মতামত

সর্বশেষ খবর

WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com