এ’তেকাফঃ আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের মাধ্যম

এ’তেকাফঃ আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের মাধ্যম

গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির

আজ বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে মহান আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের আশায় সওয়াবের নিয়তে দুনিয়ার সকল কর্মকান্ড থেকে বিরত থেকে ইবাদতের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করা। যাকে বলা হয় এ’তেকাফ । এরশাদ হচ্ছে, ” মুফরাদাত ফি গারীবিল অর্থাৎ জাগতিক সকল কর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরিবার থেকে পৃথক হয়ে আল্লাহর উদ্দেশ্যে একান্তভাবে ইবাদত করার জন্য মসজিদে অবস্থান করাই হলো এ’তেকাফ।
এ’তেকাফ আল্লাহ প্রেমের বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহর মুহব্বতে মগ্ন থাকার কার্যকরি ও গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত এ’তেকাফ। আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের পাশাপাশি একজন মুমেন দুনিয়ার যাবতীয় কর্মকান্ড, চিন্তা- চেতনা, কামনা- বাসনা,মেধা ও শ্রমের ব্যবহার এবং নিজ যোগ্যতাকে কিছু দিনের জন্য মহান আল্লাহর স্মরণে নিয়োজিত করে ঈমান- আমলকে বৃদ্ধি করার সুর্বণ সুযোগ করে দেয় এ’তেকাফ।এভাবেই একজন বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে ধন্য হবে বিশ্তদ্ধ নিয়তে যথাযথ আমলের মাধ্যমে।
পরম আবেদন, পুর্ণ আত্নিক প্রশান্তি,স্থির চিত্ততা,চিন্তা ও হৃদয়ের একাগ্রতা, বিনয়ে অবনমিত হয়ে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন এবং মহান আল্লাহর রহমতের দরজায় পড়ে থাকার মহা সৌভাগ্য অর্জিত হয় এ’তেকাফের মাধ্যমে।এ’তেকাফের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লামা ইবনুল কায়্যিম বলেন, ” এ’তেকাফ” গায়রুল্লাহর মোহময় বেড়াজাল থেকে মুক্তি লাভ করে আল্লাহর সঙ্গে গভীর ও প্রেমময় সম্পর্ক স্থাপন করে। শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহঃ লিখেছেন, ” মসজিদে এ’তেকাফ হল আত্নিক প্রশান্তি, চিন্তার বিশুদ্ধতা, ফেরেশতাকুলের গুনাবলি অর্জন, শবে কদরের সৌভাগ্য ও কল্যাণ লাভসহ সকল প্রকার ইবাদতের সুযোগ লাভের এক সর্বোত্তম উপায়।”
এ’ তেকাফের মাধ্যমে নিজেকে আল্লাহর সমীপে পরিপূর্ণ সপে দেয়া হয়। জাগতিক চিন্তাধারা ও জাগতিক সকল প্রয়োজনীয়তাকে সাময়িক স্থগিত রেখে পরকালের স্মরণে ছুটে চলার জলন্ত শিক্ষা এ’তেকাফ। ইবাদতের মানন্নোয়ন, আল্লাহর সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপন ও নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ থেকে রেজামন্দি হাসিল করা যায়।
সিয়াম বা রোজা পালনকারীদের জন্য পবিত্র মাহে রমজানের শেষ দশক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর হাবীব হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শেষ দশককে খুবই গুরুত্ব দিতেন। মাহে রমজানের শেষ দশকে এ’ তেকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা কেফায়া( সুন্নাত)। ( দুররে মুখতার-১২৯)
একটি মসজিদের মুসল্লীদের মধ্য থেকে কাউকে না কাউকে এ’ তেকাফ করতেই হবে, নয়তো সবাই গুনাহগার হবে। এ’ তেকাফ ১০ দিন বা ৯ দিন নয়, ইচ্ছে এক বা একাধিক দিনও করা যায়। তবে দশদিনই উত্তম এবং এটাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাত। রমজানের বিশ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্ব হতে শাওয়ালের ( ঈদুল ফিতরের) চাঁদ দেখা পর্যন্ত এ’ তেকাফ করতে হয়। ( বুখারি-২০৪০, মুসলিম -১১৬৭)।
এ’ তেকাফের গুরুত্ব দিয়ে আল কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ” ওয়ালাতুবাশিরু হুন্না ওয়া – আনতুম আকিফুনা ফিল মাসাজিদ”। ( সূরা বাকারাঃ১৮৭) আর যতক্ষণ তোমরা এ’ তেকাফ অবস্থায় মসজিদে অবস্থান কর, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা স্ত্রীদের সঙ্গে মিশো না। এ’ তেকাফের ব্যাপারে প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কতবেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তা আমরা হাদিস শরীফ থেকে সহজেই জানতে পারি। হযরত ইবনে ওমর রাঃ থেকে বর্ণিত, মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের শেষ ১০ দিন এ’ তেফাক করতেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এ’ তেকাফকারী মূলত গোনাহ থেকে দূরে থাকে এবং তাকে এ’ তেকাফের বিনিময়ে এত বেশি নেকী দেয়া হবে যেন সে নেককারদের সব নেকী অর্জনকারী। ( ইবনে মাজাহ-১৭৮১)।
হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে আরো বর্ণিত, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি তার কোনো ভাইয়ের প্রয়োজন মেটাতে হাটবে, তা তার জন্য ১০ বছর এ’ তেকাফ করার চেয়েও কল্যাণকর হবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এ’ তেকাফ করবে, আল্লাহ তায়ালা তার এবং জাহান্নামের আগুনের মধ্যে তিনটি পরিখার দূরত্ব সৃষ্টি করবেন, প্রত্যেক পরিখার প্রসস্থতা আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী ব্যবধানের চেয়েও বেশি।( বায়হাকী,শুয়াবুল ঈমান-৪২৫)। হযরত আয়েশা রাঃ বলেছেন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের শেষ দশকে এ’ তেকাফ করতেন। আরো বর্ণিত আছে যে, এক বছর এ’ তেকাফের ব্যাপারে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর স্ত্রীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা দেখা দেয়, সে বছর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ’ তেকাফ করেননি। কিন্তু পরের মাস শাওয়ালের শেষ দশদিন ঐ এ’ তেকাফ তিনি কাযা করে নেন।( বুখারি২০৩৩,মুসলিম১৭৭৩) । হযরত উবাই ইবনে কা’ব রাঃ থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাহে রমজানের শেষ দশকে প্রত্যেক বছর এ’ তেকাফ করতেন। এক বছর তিনি ঐ সময়ে সফরে থাকায় এ’ তেকাফ করতে পারেননি। তাই পরের বছর বিশ দিন এ’ তেকাফ করেন। ( আবু দাউদ -২৪৬৪)
হাসান ইবনে আলী রাঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি রমজানের দশদিন এ’তেকাফ করল সে যেন দুই ওমরা করলো। ( শুয়াবুল ঈমান-৪২৫), বিশিষ্ট তাবেয়ী হাসান বসরী রহঃ বলেন, এ’ তেকাফকারীর জন্য প্রত্যেক দিনের বদলে একটি করে হজ্বের সওয়াব রয়েছে। ( তাফসীরে দুররে মানসুর-২০২)। এ হাদীস গুলো সনদ নিয়ে বেশ কথা রয়েছে তবে,হাদিস বিশারদগণের মূলনীতির আলোকে তা ফজিলতের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য।
ইসলাম বৈরাগ্যবাদকে কখনো সমর্থন করে না। সমাজ- সংসার, লোকালয় ছেড়ে নির্জনে ধ্যানমগ্ন হয়ে সন্ন্যাসি থাকা ইসলাম সমর্থন করে না। তবে রমজান মাসের এই এ’তেকাফ বা মসজিদে অবস্থান আল্লাহ প্রাপ্তির অপূর্ব সুযোগ।এটি অত্যন্ত ফজিলত ও গুরুত্ববহ। এটাকে বৈরাগ্যবাদের সাথে তুলনা জ্ঞানের স্বল্পতা। এ’তেকাফের কারণে মুতাকিফ ব্যক্তির লাইলাতুল কদর প্রাপ্তিও ঘটে যায়। কে হতে পারে এত বড় সৌভাগ্যবান – যার লাইলাতুল কদর প্রাপ্তি হয় এ’ তেকাফের বদৌলতে। হাদীস শরীফের পাতা থেকে ও আর কোরআনের আলোকে যা জানা গেল তাতে এ’ তেকাফ যে কত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত তা ঈমানদার মুমিনদের নিকট সহজেই অনুমেয়। প্রতীয়মান হয় যে, মাহে রমজানের শেষ দশকের এ’তেকাফ আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য অনন্য মাধ্যম। অত্যাধিক বৈশিষ্ট্য পূর্ণ রমজানের শেষ দশকের এ’ তেকাফ আল্লাহর একান্ত প্রিয় বানায়। এ সময় দুনিয়ার সকল মুহাব্বত ভুলে গিয়ে একমাত্র দয়ালু দাতা রাজাধিরাজ আল্লাহর রহমতের দরজায় ধ্যানমগ্ন হয় মুতাকিফ। বিশ রমজান সূর্যাস্তের পূর্ব মুহূর্ত থেকে পশ্চিম আকাশ ঈদের সুরু চাঁদ উদিত হওয়া পর্যন্ত একনিষ্ঠ হৃদয়ে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতে মসজিদে এ’ তেকাফ করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা ওয়ালাল কেফায়া। এ’ তেকাফে আল্লাহ সান্নিধ্যে আত্মশুদ্ধির জন্য বসে যা করা জরুরীঃ আল্লাহর নৈকট্য লাভে একনিষ্ঠ আত্ননিয়োগ করতে হবে। পরকালের মুক্তির জন্য যাবতীয় নেক কাজের বাস্তব জীবন্ত আমল করতে হবে। যিনি কল্যাণকর কথা ছাড়া কোন শব্দও মুখ থেকে উচ্চারণ না করা। আলস্যের চাদর ঝেড়ে ফেলে বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত, নফল নামাজ , দরুদ শরীফ, তাসবীহ- তাহলীলে নিমজ্জিত থাকা। কোরআনের তাফসির, হাদিস শরীফ, ফেকাহ ও ইসলামী সাহিত্য অধ্যায়ন করা উত্তম।
এ’ তেকাফে যা অবশ্যই বর্জন করা প্রয়োজন,যা করলে দ্রুত আত্মশুদ্ধি হয়ঃ মিথ্যা বলা,গীবত করা, কানাকানি, ফিসফিসানি, চোগলখুরি, মেজাজের ভারসাম্যহীনতা, একঘেয়েমি সহ সকল গুনাহর কাজ ত্যাগ করা। অশ্লীল, অনর্থক পার্থিব কথা- বার্তা বর্জন করা। ইন্টারনেট ও সোশ্যাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার না করা ফেইসবুক, টুইটারে ঢু না মারা। মোবাইল ফোনে গল্প গুজব না করা। এ সব থেকে বিরত থাকতে পারলে গোনাহ মাফের এ মোক্ষম সুযোগে মহান আল্লাহ তায়ালার ভালবাসার সেতুবন্ধন তৈরি করতে মুতাকিফের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। সুতরাং আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনে এ’তেকাফের এ গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের মধ্যদিয়ে আল্লাহ তায়ালার ভালবাসায় সিক্ত হই।
পরিশেষে, মাসব্যাপী, ইবাদত- বন্দেগী, কোরআন তেলাওয়াত, দোয়া, দরুদ, সেহেরি- ইফতার, তারাবি, দান- সদকা সহ যাবতীয় নেক আমলগুলো মাহে রমজানের ও দয়াল নবীজির উছিলায় মহান আল্লাহ তায়ালা যেন কবুল করেন। আমিন।।
লেখকঃ গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির, সাংবাদিক, কলামিস্ট, ধর্ম ও সমাজ গবেষক, কুমিল্লা।

  • শেয়ার করুন
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com