আত্মশুদ্ধির মাস মাহে রমজান | Ekushey Bangla | একুশে বাংলা

আত্মশুদ্ধির মাস মাহে রমজান

আত্মশুদ্ধির মাস মাহে রমজান

আরবী বার মাসের মধ্যে নবম মাসটি হলো রমজান মাস। এই মাসটির গুরত্ব ও তাৎপর্যতা অন্যান্য মাসের তুলনায় অনেক বেশি। এই মাসে মুসলমানদের সংবিধান অর্থ্যাৎ জীবন পরিচালনাকারী দিকনির্দেশিকা মহাগ্রন্থ আল কোরআন নাযিল হয়েছে-যার ধারক ও বাহক ছিলেন বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত-দু’জাহানের বাদশা; সৃষ্টিকূলের শিরোমনি এবং পৃথিবীর রহমত স্বরূপ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ও মনিষি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)। যার সৃষ্টি না হলে আকাশ-বাসাত, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র-তারকারাজি, পাহাড়-পর্বত, নদ-নদী, সাগর-মহাসাগর, ফেরেস্তাকূল, জান্নাত-জাহান্নাম কিছুই সৃষ্টি হতো না।
প্রবাহমান এই জীবনে রমজান আসে আর যায়। কিন্ত রমজানের মূল শিক্ষাকে আমরা ধারন ও লালন করতে পারি না। পশ্চিম আকাশে জ্বলজ্বলে নতুন চাঁদের আবির্ভাব হলেই রোযা রাখা শুরু হয় আবার এই চাঁদটি পরিপূর্ণতা পাওয়ার পর ক্ষয় হয়ে নিঃশেষ হওয়ার পর আবার নতুন করে আরেকটি সরু বাকা চাঁদের আর্বিভাব হলে আমরা মহা দুম-ধামের মাধ্যমে ঈদের উৎসব পালন করে রমজানকে এক বছরের জন্য বিদায় জানাই। এই এক বছরের মধ্যে কত মানুষ বিদায় নেয় আবার কত নতুন মানব সন্তানের আগমন ঘটে। জন্ম আর মৃত্যু-এই খেলা চলছে সৃষ্টির শুরু থেকে আজ আবধি এবং চলবে ধ্বংসলীলা সাঙ্গ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবন পরিচালনা করার জন্য নিয়ম-নীতি, আদেশ-নিষেধ এবং প্রয়োজনীয় সকল কাজের সমাধান স্বরূপ নাযিল হয়েছে মহাগ্রন্থ আল-কোরআন আর রোজা হলো বার মাসের মধ্যে এগার মাসের ধর্মীয় রীতি-নীতি ধারণ করার ও ধৈর্য্য শক্তি অর্জনের মাস অর্থ্যাৎ রমজানের একটি মাস হলো মুসলিমদের জন্য ট্রেনিংয়ের মাস। এই মাসে একজন মানুষ নিজেকে সত্যিকার মানব রূপে গঠন করার সুযোগ লাভ করে-যদি সে সঠিক ভাবে রমজান মাঝে রোযার সকল নিয়ম-কানুন পালন করতে পারে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র আল-কোরআনের সূরা বাকারার ১৮৩ নং আয়াতে বলেন,হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হইল, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হইয়াছিল, যাহাতে তোমরা মুত্তাকী হইতে পার।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের এই বক্তব্য থেকে বুঝা গেল- মুত্তাকী হতে হলে সিয়াম পালন করতে হবে। আরবী সওম শব্দ থেকে সিয়াম শব্দের আবির্ভাব অর্থ্যাৎ সিয়াম হলো সওমের বহুবচন। সওমের আভিধানিক বা শাব্দিক অর্থ হলো আল-ইমছাক অর্থ্যাৎ বিরত থাকা।
শরীয়তের পরিভাষায়-সুবহে সাফদক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোযা রাখার নিয়তে রোযা ভঙ্গকারী কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকার নাম হচ্ছে সওম।
সওম বা রোযা মানুষকে আত্মশুদ্ধি করে। আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে হলে-আত্মসমালোচনা প্রয়োজন আত্মসমালোচনা ছাড়া আত্মশুদ্ধিতা অর্জন করা অসম্ভব। যে ব্যক্তি নিয়মিত আত্মসমালোচনা করবে; তখন তার দ্বারা কোন খারাপ কাজ সংগঠিত হবে না বা সে কোন রকম খারাপ কাজের সাথে জড়িত হবে না। তখন তার মধ্যে লুকায়িত মানব সত্তা জাগ্রত হয়ে উঠবে আর পশুসত্তা বিলুপ্তি হয়ে যাবে; তখনই মানুষ মুত্তাকী ও ফরহেজগারী রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।
একটি মাস সিয়াম সাধনার ফলে মানুষ প্রতিদিনই তার কৃতকর্মের উপর পর্যালোচনা করে: ফলে তার মধ্যে আত্মশুদ্ধি শুরু হয়। তখন সে খারাপ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে শুরু করে। এভাবে ক্রমধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলতে থাকলে একটি সময় আত্ম-ইন্দ্রিয়গুলোর মধ্যে আত্মশুদ্ধির ছোঁয়া লাগে এবং রিপুগুলো নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। রিপুগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে প্রখর উত্তাপ হজম করে অনেক সাধনার পরে সর্বসাধন অর্জিত হয় এবং মুত্তাকীদের কাতারে নিজেকে দাঁড় করানো সম্ভব হয়। সিয়াম সাধনার ফলে মানুষের কাম ইন্দ্রিয়সহ সকল ইন্দ্রিয়গুলোর কূ-ভাসনা,স্বভাব-চরিত্রগুলো জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। ফলে মানুষের মনে তখন আর ভোগ-বিলাস এর অভিলাষ বিলুপ্ত হয়ে যায়। সাথে সাথে মানুষের ভেতরে-বাহিরের সকল পাপ ধুয়ে মুছে গিয়ে নতুন জন্ম নেওয়া শিশুতে পরিণত হয়।
এই সর্ম্পকে আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং আল্লাহর সন্তষ্টির উদ্দেশ্যে রামাদান মাসের সিয়াম পালন করবে তার পূর্ববর্তী সকল পাপ ক্ষমা করা হবে।(বুখারী)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বুঝা যচ্ছে যে, শুধু মাত্র আহার-বিহার ও কাম ইন্দ্রিয় এর কার্যক্রম বন্ধ রাখলেই সিয়াম পূর্ণ হবে না। একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষে সিয়াম সাধনা করতে হবে অর্থ্যাৎ সকল পানাহার থেকে বিরত থাকতে হবে। কিন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে অনেকেই সাওমের মূল বিষয়বস্তু থেকে অনেক দূরে থাকে।
অর্থ্যাৎ লোক দেখানো সিয়াম সাধনা করে। মূলত: নিজেকে রোজাদার হিসেবে দাবি করলেও কৃতকর্মের জন্য আত্মসমালোচনা করে না এবং আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। ফলে তারা মুত্তাকীদের অর্ন্তভূক্ত হতে পারে না।
এখানে একটি ঘটনা উল্লেখ করি-গত কয়েক বছর পূর্বে একজন সরকারী কর্মকর্তা অর্থ্যাৎ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ের সি,এ পদধারী কর্মকর্তা। তিনি রোজা রেখেছেন। যোহরের আযানের পরে অজু করে মসজিদের ঘাটে দাঁড়িয়ে অন্য একজন লোকের জন্য অপেক্ষায় আছেন। উপজেলা কেন্দ্রীয় মসজিদের বিভিন্ন পেশার মানুষ নামাজ পড়ার জন্য হাজির হচ্ছে। এমন সময় ঐ সরকারী কর্মকর্তার হাতে মুসল্লিদের মধ্যে একজন কিছু টাকা দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্ত বক ধার্মিক কর্মকর্তা টাকা হাতে নিচ্ছে না। কতক্ষণ টানা-টানি করার পর কর্মকর্তা বলছেন-দেখে আমি এখন রোজাদার। এখন এই টাকা হাতে নেব না। কষ্ট করে সন্ধ্যার পরে সাক্ষাত করেন। ঐ ব্যক্তিও নাছোর বান্দা ঘুষের টাকা তার হাতে দিয়েই ছাড়বে-কারণ তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ফাইল সিএ সাহেবের নিকট আটকানো রয়েছে। তাই ঘুষ প্রদান করে ফাইলটি ছাড়িয়ে নিতে হবে। কতক্ষণ পড়ে লোকটির পীড়াপিড়িতে বাধ্য হয়ে বলল-ভাই; আপনি তো আমার রোজাটাকে নষ্ট করে দিয়ে তবেই ক্ষান্ত হবেন। দেন-দেন; আমার পাঞ্জাবীর পকেটে দেন বলে-পাঞ্জাবীর পকেটটি তুলে ধরলেন আর বললেন-আমার ওজুটা নষ্ট করবেন না। এই হলো আমাদের রোজদার ও ফরহেজগার ব্যক্তির চিত্র।
তাছাড়া আমাদের দেশে রোজার মাসে দিনের বেলায় অবাধে চলে খানা-পিনা। দিনে দুপুরে হাট-বাজার ও পাড়া-মহল্লার দোকান গুলোতে দরজায় একটি চাদর টাঙ্গিয়ে ভেতরে চলে ধুমছে খানা-পিনা। আবার আমরা নিজেদের পরিচয় দেই- আমরা মুসলমান। রোযা আসলেও আমাদের চাল-চলনের কোন পরিবর্তন হয় না। আমাদের স্বভাব পরিবর্তন হয় না। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ধর্মীয় উৎসব আসলে জিনিসপত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম কমে আর আমাদের দেশের নিয়ম হলো দাম যত বাড়ানো যায়। মজুদ রেখে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মুনাফা অর্জনের পায়তারায় ব্যস্ত থাকে ব্যবসায়িরা-তারাও নিজেদেরকে মুসলিম দাবি করে ও রোজাদার দাবি করে। এই ঘুষখোর ও মুনাফাখোরদের রোযা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু।
বুখারী শরীফের ১৭৯৫ নং হাদিসে বর্ণনা রয়েছে রোজা ঢাল স্বরূপ। সুতরাং কেউ যেন গালাগালি না করে এবং মূর্খতা স্বরূপ আচরন না করে।
অতএব রোজার মাসের পবিত্রতা বজায় রেখে নিজের আত্ম-সমালোচনার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন করে মুত্তাকী হতে হবে। যা শুধু এক মাসের জন্য নয়-তার ধারাবাহিকতা যেন বারটি মাস আমাদের হৃদয়ে জাগ্রত থাকে। তবে-ই পবিত্র মাহে রমজানের শিক্ষা আমাদেরকে আত্ম-মুক্তির দিকনির্দেশনা প্রদান করবে-আমরা খুঁজে পাব প্রকৃত জীবন ব্যবস্থা: যেখানে থাকবে অনাবিল শান্তি। মানব সমাজ ব্যবস্থা থেকে দূর হয়ে যাবে হিংস্বা-বিদ্বেষ, হানাহানি-রাহাজানি, খুন-ধর্ষন,গিবত-অহংকার। পরস্পরের মধ্যে সৃষ্টি হবে ভাতৃত্বের বন্ধন।

ফেসবুক মতামত

WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com