আত্মজৈবনিক বঙ্গবন্ধু | Ekushey Bangla | একুশে বাংলা

আত্মজৈবনিক বঙ্গবন্ধু

আত্মজৈবনিক বঙ্গবন্ধু

স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সমকালীন নেতৃবর্গের মৌলিক পার্থক্য এই যে, অন্য কেউ একটি জাতির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তব রূপ দিতে গিয়ে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনকে এত কঠোরতার সঙ্গে বিসর্জন দেননি। মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে একটি জাতির পরিত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার এমন উদাহরণ বিরল। ফিদেল ক্যাস্ত্রো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাতের পর বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, তবে বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি।’ এমন অতি মানবীয় উচ্চতায় বঙ্গবন্ধুর আসীন হওয়া কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়। তিল তিল পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন। একটি নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর আশা ও বেদনাকে চেতনায় ধারণ করে তাদেরই একজন হয়ে সেই জনগোষ্ঠীর মুক্তিদাতা হয়ে ওঠার অসামান্য দলিল ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’।

বইটিতে বর্ণিত বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীর কালকে তিনটি পর্বে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্ব (১৯২০-১৯৪২), তার জন্ম থেকে শুরু করে ১৯৪২ সালে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করা পর্যন্ত। দ্বিতীয় পর্ব (১৯৪২-১৯৪৭), কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি ও বেকার হোস্টেলে থাকা থেকে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় ফিরে আসার পূর্ব পর্যন্ত। তৃতীয় পর্ব (১৯৪৭-১৯৫৪), ভারত বিভক্তি ও পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে বঙ্গবন্ধুর ঢাকা আগমন থেকে ১৯৫৪ সালের শেষের দিকে বগুড়ার মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে গঠিত ‘কেবিনেট অব ট্যালেন্টস’-এ আইনমন্ত্রী হিসেবে সোহরাওয়ার্দীর যোগদান এবং যুক্তফ্রন্টের নেতা হিসেবে শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন পর্যন্ত।

এই আত্মজীবনী লেখার মূল প্রেরণা বঙ্গবন্ধু পেয়েছিলেন তার সহধর্মিণী রেণুর (বেগম ফজিলাতুন্নেছা) কাছ থেকে। বাল্যকালে বাবা-মা হারানো চাচাতো বোন রেণুর সঙ্গে তার শৈশবে বিবাহ হয়। বঙ্গবন্ধুর জীবনে এ মহীয়সী নারীর প্রভাব অপরিসীম। এ সম্বন্ধে বঙ্গবন্ধু বলেন-

আমার সহধর্মিণী একদিন জেল গেটে বসে বলল, ‘বসেই তো আছ লেখ তোমার জীবনের কাহিনী।’ বললাম ‘লিখতে যে পারি না; আর এমনকি করেছি যা লেখা যায়!’ আমার জীবনের ঘটনাগুলো জেনে জনসাধারণের কি কোনো কাজে লাগবে? কিছুই তো করতে পারলাম না…আমার স্ত্রী যার ডাক নাম রেণু- আমাকে কয়েকটা খাতাও কিনে জেলগেটে দিয়ে গিয়েছিল। জেল কর্তৃপক্ষ যথারীতি পরীক্ষা করে খাতা কয়টা আমাকে দিয়েছেন। রেণু আরও একদিন জেলগেটে বসে আমাকে অনুরোধ করেছিল। তাই আজ লিখতে শুরু করলাম।

বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। বঙ্গবন্ধুকে প্রচণ্ড স্নেহ করতেন। বঙ্গবন্ধুও নেতার প্রতি অনুগত ও শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। সোহরাওয়ার্দী সম্পর্কে এ বইয়ের একটি বড় অংশজুড়ে বঙ্গবন্ধুর মূল্যায়ন রয়েছে। আত্মজীবনীতে এ ছাড়াও তার নেতৃত্ব, নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য, মূল্যবোধ, বাঙালির ভাষা-সমাজ-সংস্কৃতি-কৃষ্টির প্রতি বঙ্গবন্ধুর নিষ্ঠা, তার রাষ্ট্রভাবনা, ইতিহাস চেতনা, কারাস্মৃতি, পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে বৈষম্য, ভাষা-আন্দোলন, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ইত্যাদি বিষয় নানাভাবে স্থান পেয়েছে।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন মনেপ্রাণে খাঁটি বাঙালি ও দেশপ্রেমিক। বাংলার নদী, বাংলার জল, বাঙালির খাবার, বাংলার ফল, বাংলার গান, বাংলার সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা উর্বর জমি আর নৈসর্গিক সৌন্দর্য তাকে সর্বদা মুগ্ধ করত। একবার এক অনুষ্ঠান শেষে ঢাকার উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বাংলার শ্রেষ্ঠ লোকসঙ্গীত শিল্পী আব্বাসউদ্দিনসহ নৌকাযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আশুগঞ্জ আসছিলেন। পথে আব্বাসউদ্দিনের কণ্ঠে ভাটিয়ালি গান শুনে তিনি খুবই মুগ্ধ হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়-

নদীতে বসে আব্বাসউদ্দিন সাহেবের ভাটিয়ালি গান তার নিজের গলায় না শুনলে জীবনের একটা দিক অপূর্ণ থেকে যেত। তিনি যখন আস্তে আস্তে গান গাইতেছিলেন তখন মনে হচ্ছিল, নদীর ঢেউগুলোও যেন তার গান শুনছে। আমি আব্বাসউদ্দিন সাহেবের ভক্ত হয়ে পড়েছিলাম।

একই বছর পাকিস্তানের রাজধানী করাচি ভ্রমণকালে সেখানকার ভূ-প্রকৃতি দেখে তার মনে যে ভিন্ন অনুভূতি হয়েছিল, সে সম্বন্ধে বঙ্গবন্ধু বলেন-

আমি এই প্রথম করাচি দেখলাম… আমরা জন্মগ্রহণ করেছি সবুজের দেশে, যে দিকে তাকানো যায় সবুজের মেলা। মরুভূমির এ পাষাণ বালু আমাদের পছন্দ হবে কেন?

বাঙালি খাবারের প্রতি বঙ্গবন্ধুর প্রীতির কথা তার বিভিন্ন ভ্রমণ-অভিজ্ঞতার বর্ণনা থেকে জানা যায়। ১৯৪৯ সালে একবার সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তিনি পশ্চিম পাকিস্তান যান এবং এক মাসের মতো সেখানে ছিলেন। একটি মামলা পরিচালনার জন্য সোহরাওয়ার্দী তখন পাঞ্জাবের লাহোরে অবস্থান করছিলেন। ‘ঢাকায় ফিরে এলে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুকে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার করবে, আর লাহোরে থাকলে নাও করতে পারে’ সোহরাওয়ার্দী বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশে এমন কথা বললে, উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন-

…..যা হওয়ার পূর্ব বাংলায় হোক, পূর্ব বাংলার জেলে ভাত পাওয়া যাবে, পাঞ্জাবে রুটি খেলে আমি বাঁচতে পারব না। রুটি আর মাংস খেতে খেতে আমার আর সহ্য হচ্ছে না।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীর পরিপূরক বই বঙ্গবন্ধুর দিনলিপি ‘কারাগারের রোজনামচা’। এক সাধারণ কিশোর থেকে বাঙালি জাতির মহানায়ক হয়ে উঠার প্রস্তুতিপর্বের দলিল ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। আর ‘কারাগারে রোজনামচা’ বন্ধুর পথ অতিক্রম করে একটি জাতির স্বাধীনতার গন্তব্যে এগিয়ে যাওয়ার আত্মপ্রত্যয়ী স্মারক। ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে, অগণিত প্রাণ বিসর্জন দিয়ে ধীরে ধীরে স্বাধীনতার লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার উদ্দীপনাসঞ্চারী ঘটনা প্রবাহ বঙ্গবন্ধু লিপিবদ্ধ করেছেন এ বইয়ে।

জেলখানায় বসে বঙ্গবন্ধু ছটফট করতেন সংবাদপত্র পড়ার জন্য। ইত্তেফাক, সংবাদ, আজাদী, পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকা পড়ে দেশের ও বিশ্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত হতেন। মুক্তিকামী বাঙালির আন্দোলনের খবরে তিনি খুশি হচ্ছেন, তাদের ওপর নির্যাতনের খবরে বিচলিত হচ্ছেন। কিন্তু কখনও তার আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরেনি। ১৯৬৬-এর ৬ জুন তিনি লিখেছেন-

ত্যাগ বৃথা যাবে না, যায় নাই কোনো দিন। নিজে ভোগ নাও করতে পারি, দেখে যেতে নাও পারি, তবে ভবিষ্যৎ বংশধররা আজাদী ভোগ করবে। কারাগারের পাষাণ প্রাচীর আমাকেও পাষাণ করে তুলেছে। এ দেশের লাখ লাখ কোটি কোটি মা-বোনের দোয়া আছে আমাদের ওপর। জয়ী আমরা হবই। ত্যাগের মাধ্যমে আদর্শের জয় হয়।

‘কারাগারের রোজনামচা’র পরতে পরতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের তল্পিবাহকদের গণবিরোধী কার্যক্রমের নিন্দা করেছেন বঙ্গবন্ধু। তীব্র রসবোধেরও পরিচয় দিয়েছেন তিনি। ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়েও পাকিস্তান ইন্দোনেশিয়াকে চৌদ্দ কোটি টাকা ঋণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সংবাদ জেনে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন-

যে সরকার ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে দুনিয়া ভর ঘুরে বেড়াচ্ছে, আমেরিকা সাহায্য না দিলে যারা বাজেট পেশ করতে পারে না, দিন দিন জনগণের ওপর করের বোঝা চাপাইয়া অতিষ্ঠ করে তুলেছে, তারা আবার ঋণ দিতে রাজি! এভাবেই আমরা ইসলামের খেদমত করছি! কারণ না খেয়ে অন্যকে খাওয়ানো তো ইসলামের হুকুম। দয়ার মন আমাদের! এমন প্রেম ভালোবাসাই তো আমাদের নীতি হওয়া উচিত! কাপড় যদি কারও না থাকে তাকে কাপড়খানা খুলে দিয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে বাড়ি চলে আসবা। আমাদের সরকারের অবস্থাও তাই।

ভিন্ন রাজনৈতিক মত দমনের জন্য, বিরোধী রাজনীতিকদের মুখ বন্ধ করার জন্য স্বৈরশাসক আইয়ুব খান চেষ্টার ত্রুটি করেননি। মিথ্যা মামলা দিয়ে অগণিত নেতাকর্মীদের জেলে পুরেছেন তিনি। তাদের স্বজনদের হাহাকার বঙ্গবন্ধুর কোমল হৃদয়কে স্পর্শ করেছে। নিজের কষ্ট ভুলে তিনি স্মরণ করেছেন হতভাগ্য বন্দিদের পরিবারের কথা-

কে বুঝবে আমাদের মতো রাজনৈতিক বন্দিদের বুকের ব্যথা। আমার ছেলেমেয়েদের তো থাকা খাওয়ার চিন্তা করতে হবে না। এমন অনেক লোক আছে যাদের স্ত্রীদের ভিক্ষা করে, পরের বাড়ি খেটে, এমনকি ইজ্জত দিয়েও সংসার চালাতে হয়েছে। জীবনে অনেক রাজবন্দির স্ত্রী বা ছেলেমেয়ের চিঠি পড়ার সুযোগ আমার হয়েছে। সে-করুণ কাহিনী কল্পনা করতেও ভয় হয়।

সোহরাওয়ার্দীর পর যার পরামর্শ ও স্নেহকে বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে মূল্য দিয়েছেন তিনি ইত্তেফাকের সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। তাকেও একাধিকবার গ্রেফতার করা হয়। মানিক মিয়া সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর যে মূল্যায়ন তাতে স্বাধীন গণমাধ্যমের অনন্যসাধারণ শক্তি সম্পর্কে আঁচ পাওয়া যায়।

দিনলিপির প্রতিটি পৃষ্ঠা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক ভাবনার পরিচায়ক। তার সাহিত্যপ্রেমের পরিচয়ও মেলে এখানে। এমিল জোলার বই পড়ছেন। রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করে আত্মবিশ্বাস ধরে রাখছেন। অসুস্থ পিতা-মাতা, অসহায় স্ত্রী, পুত্র-কন্যাদের সঙ্গে বিচ্ছেদে যখন কষ্ট পেয়েছেন তখন স্মরণ করেছেন কবিগুরুর অমর বাণী- ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো/এ নহে মোর প্রার্থনা/বিপদে আমি না যেন করি ভয়।’ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দিয়ে বঙ্গবন্ধু ও তার সহচরদের ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করে আইয়ুব খানের সরকার। সেই কঠিন সময়ের আভাস দিয়ে ‘কারাগারের রোজনামচা’র সমাপ্তি ঘটে।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’- এ দুটি বইয়েই মহৎ কথক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন বঙ্গবন্ধু। নিজের কথা যতটা না বলেছেন তার চেয়ে বেশি বলেছেন দেশের কথা। আত্মজীবনীমূলক রচনা তখনই সার্থক হয়ে ওঠে যখন তা ব্যক্তির সীমানা ছাড়িয়ে সমষ্টিকে, কালকে ধারণ করে। বঙ্গবন্ধু এ বই দুটিতে শুধু সেই সার্থকতাই অর্জন করেননি, বাঙালির হাজার বছরের লালিত স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার স্বাক্ষরও রেখে গেছেন।

লেখক –

মোহাম্মদ সাখাওয়াত হাফিজ,

সম্পাদক ও প্রকাশক, একুশে বাংলা

 

ফেসবুক মতামত

সর্বশেষ খবর

WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com