আঙুল আছে, ছাপ নেই: তিন প্রজন্ম ধরে বিরল রোগে আক্রান্ত রাজশাহীর এই পরিবার

আঙুল আছে, ছাপ নেই: তিন প্রজন্ম ধরে বিরল রোগে আক্রান্ত রাজশাহীর এই পরিবার

জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য আঙুলের ছাপ দিতে গিয়ে অভাবনীয় এক সমস্যার মুখোমুখি হন রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার পচামাড়িয়া গ্রামের অমল সরকার। বারবার আঙুলের ছাপ নেয়ার চেষ্টা চলে তার। কিন্তু কিছুতেই ছাপ ওঠে না। অগত্যা এনআইডি কার্ডে লেখা হয়, ‘আঙুলের ছাপ নেই’। বিড়ম্বনার এখানেই শেষ নয়। একই অবস্থা হয় তার ছেলে অপু সরকারের। আঙুলের ছাপ ছাড়া স্মার্ট কার্ড কীভাবে হবে? শেষে অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর অমল আর তার ছেলে অপুর রেটিনা স্ক্যান করে স্মার্ট কার্ড করা হয়েছে। অমলের বড়ভাই গোপেশ সরকার তো পড়েছিলেন আরেক যন্ত্রণায়। পাসপোর্টের আবেদন করার পর আঙুলের ছাপ আর দেয়া যায় না। স্থানীয় কর্মকর্তারা নিরুপায়। গোপেশও নাছোড়বান্দা। শেষমেশ কয়েকবার ঢাকায় গিয়ে পাসপোর্ট অধিদফতরে ধর্না দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বোঝাতে সক্ষম হন বিষয়টি। প্রায় দুবছর অপেক্ষার পর সম্প্রতি পাসপোর্ট হাতে পেয়েছেন তিনি। তবে এসব কাজ সম্পন্ন করার জন্য এই পরিবারটিকে চিকিৎসকের শরণাপণ্ণ হতে হয়। আর তাদের কাছ থেকে নিতে হয় একটি চিকিৎসা সনদ। চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর নিশ্চিত হয়ে সেই সনদে উল্লেখ করেন, বিরল বংশগত রোগ অ্যাডারমাটোগ্লিফিয়ায় আক্রান্ত এই পরিবার। পুঠিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নাজমা আক্তার জানান, অমল সরকারের ছেলে, ভাই ও ভাইপোসহ মোট ৬ জন এই রোগে আক্রান্ত। এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশেই প্রথম এই রোগ শনাক্ত হয়েছে বলে নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে সে কারণেই আমাদের গবেষণা করার প্রয়োজন রয়েছে।’ অমল জানান, একই সমস্যা ছিল তার বাবা এবং দাদারও। তারা দু’জনই ছিলেন তাদের বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। অমলের দুই ভাইও একই সমস্যা নিয়ে জন্মেছেন। অমল সরকার বলেন, ‘এ সমস্যার কারণে পদে পদে অপদস্থ হতে হচ্ছে। আঙুলের ছাপ না থাকায় ড্রাইভিং লাইসেন্স পাইনি। একবার বিদেশ ভ্রমণে গিয়ে বিমানবন্দরে ঝামেলায় পড়তে হয়। আমার ছেলেদেরও নিয়মিত ঝামেলার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। কৃষিকাজসহ যেকোনো ভারী কাজ করলে হাতের চামড়া খুব সহজেই ফেটে যায়।’ অমল সরকারের বড় ছেলে অপু সরকার বলেন, ‘আঙুলের ছাপের এ সমস্যা বংশগত, তাই কখনো চিকিৎসার চেষ্টা করিনি। আমার দাদারও একই সমস্যা ছিল। কিন্তু আমার দাদা মনে হয় না এটাকে কখনো সমস্যা হিসেবে দেখেছেন। মায়ের হাতে কোনো সমস্যা নেই। নিজের নামে সিমকার্ডের বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন করতে না পারায় বাবা, ছোট ভাই এবং আমি এখন মায়ের নামে তোলা সিম ব্যবহার করছি।’ ডা. নাজমা আক্তার জানান, অ্যাডারমাটোগ্লিফিয়া নামের এই বিরল বংশগত রোগের আরেক নাম ‘ইমিগ্রেশন ডিলে ডিজিজ’। এতে হাত ও পায়ের তালুতে রেখার অনুপস্থিতি, চামড়ায় রুক্ষতা ও ঘাম না হওয়ার মত সমস্যা হয়। অমল সরকারের পরিবারের ক্ষেত্রে দুই হাতেই কোনো ছাপ নেই। ডা. নাজমা আরও জানান, এই রোগের সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা এখনও সহজলভ্য নয়। ফলে এ ধরনের রোগীদের ক্ষেত্রে শনাক্তকরণ চিহ্নের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

সুত্রঃ যমুনা টিভি

  • শেয়ার করুন

সর্বশেষ খবর

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com